সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিতে বিএনপি’র শূন্যতা

সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিতে বিএনপি’র শূন্যতা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বিষয় বারবার প্রমাণিত হয়েছে-শুধু রাজনৈতিক সংগঠন বা নির্বাচনী শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করা যায় না। একটি রাজনৈতিক ধারাকে টিকে থাকতে হলে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি, সাহিত্যিক চর্চা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন এবং নতুন প্রজন্মের চিন্তাশীল নেতৃত্ব তৈরি করতে হয়। যে রাজনৈতিক শক্তি এই ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়, একসময় তাকে অন্যের তৈরি বয়ান ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।

গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, একাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাব ছিল-এমন অভিযোগ বিরোধী রাজনৈতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছে। তাদের মতে, ভিন্নমতের লেখক, শিল্পী ও চিন্তকদের অনেকেই প্রান্তিক অবস্থানে ছিলেন এবং নিজেদের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদী ধারার শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ নিজেদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জাতীয়তাবাদী লেখক পরিষদসহ কিছু সংগঠন সীমিত পরিসরে সাহিত্য সভা, আলোচনা, প্রকাশনা, কবিতা পাঠ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তারা নিজেদের চিন্তা, ইতিহাসবোধ ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো- এসব প্রচেষ্টা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন এবং সীমিত পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে যে ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা, অর্থনৈতিক সহায়তা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, পাঠচক্র এবং তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ দরকার ছিল, তা যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়নি। ফলে জাতীয়তাবাদী ধারার অনেক মেধাবী লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী থাকলেও তাদের সম্মিলিত শক্তি একটি বড় বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারেনি।

এখানেই বিএনপি’র একটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংগ্রামে সক্রিয় থাকলেও সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য শুধু নেতাকর্মী বা ভোটব্যাংক যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি চিন্তাশীল মহল, যারা রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করবে এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

বিশ্বের সফল রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের সঙ্গে যুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক, লেখক-গবেষক নেটওয়ার্ক এবং সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফরম থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু দলীয় প্রচারণা চালায় না; বরং নতুন চিন্তার জন্ম দেয়, নীতিগত বিতর্ক তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিএনপি’র ক্ষেত্রে এমন একটি সুসংগঠিত জাতীয়তাবাদী স্টাডি সার্কেল বা গবেষণা প্ল্যাটফরমের অভাব দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হচ্ছে। ফলে অনেক সময় দেখা যায়, দলটির নিজস্ব চিন্তাশীল লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন না। অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় সুযোগসন্ধানী অনেক ব্যক্তি নতুন পরিবেশে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পান-এমন অভিযোগও রয়েছে।

একটি রাজনৈতিক ধারার শক্তি শুধু তার নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেই শক্তি তৈরি হয় কবি, লেখক, শিল্পী, শিক্ষক, গবেষক এবং তরুণ চিন্তকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। সাংস্কৃতিক পরিসর অবহেলা করলে রাজনৈতিক আন্দোলনও একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ মানুষের মনোজগৎ, ইতিহাসবোধ ও মূল্যবোধের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সংস্কৃতি।
তাই বিএনপি’র সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো-অতীতের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি আধুনিক, মেধাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক দর্শন তৈরি করা। শুধু নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন মতের যোগ্য মানুষকে নিয়ে একটি মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত গবেষণা, সাহিত্য পত্রিকা, প্রকাশনা, তরুণ লেখকদের প্রশিক্ষণ, ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোচনা, আন্তর্জাতিক মানের সেমিনার এবং একটি কার্যকর সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক। কারণ কোনো রাজনৈতিক আদর্শ কেবল স্লোগানে বেঁচে থাকে না; তা টিকে থাকে বই, গবেষণা, শিল্প, সাহিত্য এবং মানুষের চিন্তার মধ্যে।

আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-বিএনপি কি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় থাকবে, নাকি একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে জাতীয়তাবাদী ধারার প্রভাব কতোটা গভীর হবে।

রাজনীতির ময়দানে বিজয় অর্জনের আগে চিন্তার জগতে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে হয়। সেই সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণের পথ অত্যন্ত মেধানির্ভর, সৃজনশীল যা পদাধিকার বলে অর্জন করা যায় না।

লেখক: কবি

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন