শিশুদের শাস্তি প্রদানের নানা ধরনের ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেখানের ক্যাপশনে লেখা হচ্ছে আপত্তিকর নানা শব্দ। টিকটকে এক ব্যবহারকারীর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে এক শিশুর মুখে বেত ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। কাঁদতে থাকা শিশুটির ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘পিচ্চি পোলাপানরে কান্না করাইতে ভালোই লাগে’।
কন্যাশিশুর ভিডিও প্রকাশ করে সেখানে ক্যাপশন লেখা হয়েছে, চোখের চাহনি টা। সেখানের কমেন্টবক্সে অন্য ব্যবহারকারীরা সরাসরি লিখেছেন, ‘বুকিং দিয়ে রাখলাম’। আবার কখনো অন্য এক কন্যাশিশুর মাস্ক খুলে তাকে আনা হচ্ছে ক্যামেরার সামনে, ক্যাপশন দেয়া হয়েছে, মাস্কের ভিতর কতো সুন্দর চেহারা। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, দুই কন্যাশিশুকে বেত দেখিয়ে কান ধরিয়ে ওঠবস করানো হচ্ছে। সেই ভিডিওতে ‘কান্নাটা সেই ছিলো’ ক্যাপশন দিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে টিকটকের মতো ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্মে। “ঘ্যারত্যাড়া শাহজাদা” নামের একটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা হয়েছে এই ধরনের ভিডিও। ওই অ্যাকাউন্টে আরো দেখা যায়, শিশুদের সাথে হাত দিয়ে ‘লাভ সিম্বল’-ও তৈরি করছেন ওই ভিডিও নির্মাতা।
টিকটক খুললেই এখন এমন ভিডিওর ছড়াছড়ি। বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের আইডি থেকে শেয়ার করা হচ্ছে এমন উদ্বেগজনক ভিডিও। প্রশ্ন উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্মেশিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে।
যে শিশুরা এমন হেনস্থার শিকার হয়েছে, ভিডিওতে দেখা তাদের আইডি কার্র্ডের ফিতার সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগের চেষ্টা করে মানবজমিন। তবে প্রতিষ্ঠানটির কারো সাথেই মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে মানবজমিন যোগাযোগ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিস ট্রাস্টের সাথে। সংস্থাটির লিগ্যাল স্পেশালিস্ট মনীষা বিশ্বাস জানান এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন রয়েছে যা শিশুদের সাইবার স্পেসেনিরাপত্তা দিয়ে থাকে। তিনি বলেন, ২০২৬ এর সাইবার সুরক্ষা আইন শিশুকে নির্যাতন করে যদি কোন ধরনের ভিডিও তৈরি করা হয়, সেক্ষেত্রে এটি চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ হিসেবে গণ্য হবে।এর প্রেক্ষিতে এই আইন অনুযায়ী এমন কন্টেন্ট ছড়ানোর দায়ে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড, ২০ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রয়েছে। এই বিশেষজ্ঞের মতে অভিভাবকরা মূলত এই সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন, যে তাদের সন্তানদের নিয়ে এমন কন্টেন্ট ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আর সেকারণেই অবিভাবকরা জানতেও পারছেন না তাদের সন্তানদের সেক্সুয়ালাইজ করে অনলাইনে ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে।
একই সাথে তিনি তুলে ধরেন এসব ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্মের স্বয়ংক্রিয় এআই ডিটেকশন টুলেরও এসব ইস্যুতে অপারগতা। তিনি বলেন, এসব প্লাটফর্মের জিরো টলারেন্স থাকা সত্ত্বেও কখনো পিছনে অন্য কোন ধরনের গান জুড়ে দিয়ে বা কন্টেন্টের রেজুলেশনের পরিবর্তন ঘটিয়ে এআই ডিটেকশন টুলকে বিভ্রান্ত করা হয়ে থাকে। তাছাড়া, ভাষাগত পার্থক্যের জন্যও এই লুপহোল তৈরি হতে পারে বলেও মত তার।
উল্লেখ্য, টিকটকে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্ল্যাটফর্মটি তদন্ত ও জরিমানার মুখে পড়েছে। যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম ২০২৬ সালে টিকটকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। অভিযোগ ছিল দুর্বল বয়স যাচাই ব্যবস্থার কারণে শিশুরা স্ব-ক্ষতি ও অন্যান্য ক্ষতিকর কনটেন্টের সংস্পর্শে আসছে। এর আগে ২০২৪ সালে শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য ভুলভাবে দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে, আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রটেকশন কমিশন ২০২৩ সালে শিশুদের গোপনীয়তা সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় টিকটককে ৩৪৫ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করে। একই বছর যুক্তরাজ্যের ইনফরমেশন কমিশনার’স অফিস ১৩ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৪ লাখ শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহের অভিযোগে টিকটকের বিরুদ্ধে ১ কোটি ২৭ লাখ পাউন্ড জরিমানা আরোপ করে। এসব ঘটনা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিকটকের নীতিমালা ও কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রতিফলন।
দেশে প্রচলিত আইন থাকলেও সে আইন কেন শিশুদের সাইবার স্পেসে সুরক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে সে বিষয়ে মনীষা বিশ্বাস বলেন, এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা কম, ফলে ল ইনফোসর্মেন্ট বা আদালতের কাছেও বিষয়টি নিয়ে দুরবোধ্যতা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। শুধু যে কন্যাশিশু টার্গেট হচ্ছে তা নয়, বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, ছেলে শিশুদের নিয়েও নানা ধরনের উদ্বেগজনক ক্যাপশনে ভিডিও পোস্ট বা তাদের ব্যক্তিগত মুহুর্তের ছবি বা ভিডিওও প্রকাশ করা হচ্ছে। বিভিন্ন কন্টেন্টে দেখা গেছে ছেলে শিশুদের নানা ধরনের ক্যাপশন দিয়ে যৌনতার বিষয়বস্তু বানানো হচ্ছে। এইচ এম নাইম হাসান নামের একটি টিকটক আইডিতে দেখা গেছে মাদ্রাসার শিশুদের খাওয়া দাওয়া, খেলাধুলার ভিডিও হরহামেশাই আপলোড করছেন তিনি। এমনকি সেখানে পড়তে থাকা কয়েকটি শিশুর দিকে ক্যামেরা তাক করে তিনি ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘কোনটা লাগবে?’। সেসব ভিডিওর কমেন্টবক্সেও দেখা গেছে নানা ধরনের যৌন উদ্দীপক মন্তব্য।
আইন ও শালিস কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অনলাইনে শিশু হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে ৪ টি। শিক্ষকের দ্বারা শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪ টি এবং শিক্ষকের দ্বারা যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ২৮ টি। তবে এই তথ্য যে সামগ্রিক ঘটনার মূলত একাংশ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই প্রতিবেদনে দেখানো ভিডিওগুলোর প্রায় সবগুলোই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের হেনস্থার ঘটনা।
কোমলমতি শিশুদের প্রতি এমন আচরণ, তাদের শাস্তি দেয়ার ভিডিও বা যৌনতার উদ্রেককারী শব্দ দিয়ে ক্যাপশন দিয়ে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার কীভাবে পরবর্তীতে শিশুদের মনস্তত্বে প্রভাব ফেলতে পারে সে বিষয়ে প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ন্যাচারে প্রকাশিত জার্নালগুলো বলছে, এর ফলে শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হতে পারে। এছাড়া পরবর্তীতে মেজর ডিপ্রেশন, সোশ্যাল অ্যাংজাইটি, ও হীনমন্যতার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিয়ে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে শুধু আইন মানলেই যথেষ্ট নয়, নিশ্চিত করতে হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থও। ভিউ, লাইক বা বিনোদনের জন্য কোনো শিশুকে অপমান, ভয় দেখানো বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত প্রকাশ করা তার মানসিক বিকাশ, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যৎ সামাজিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের নিয়ে তৈরি কনটেন্টে আরও কঠোর নজরদারি, প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকর ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা এবং অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা, সবকিছুর সমন্বয়েই নিশ্চিত করা সম্ভব শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ।
