বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত গত পাঁচ দশকে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বাধীনতার পর গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে এবং কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মডেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি, নিউরোসায়েন্স, লিভার, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, অর্থোপেডিকস, নবজাতক চিকিৎসাসহ বহু ক্ষেত্রে দেশীয় বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক মানের জটিল চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করছেন।
তবুও একটি কঠিন বাস্তবতা আজও আমাদের সামনে বিদ্যমান। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে, পাশাপাশি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়, বিমানভাড়া, আবাসন, ভিসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হয়ে দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে যা আনুমানিক ৫ বিলিয়ন ডলার ।
বিভিন্ন শিল্পভিত্তিক বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যখাত-সংশ্লিষ্ট গবেষণা এবং মেডিকেল ট্যুরিজমবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট বিদেশি ব্যয়ের পরিমাণ বছরে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি, তবে অর্থনীতিবিদ, স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসকদের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে যে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে এবং একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এটি কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, সুশাসন, গবেষণা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিদেশে যাওয়ার প্রধান কারণ কি কেবল উন্নত প্রযুক্তি?
অনেকেই মনে করেন, বিদেশে চিকিৎসা মানেই উন্নত চিকিৎসা। বাস্তবতা আরও জটিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীরা শুধু উন্নত যন্ত্রপাতির জন্য বিদেশে যান না; বরং যান একটি সমন্বিত, পূর্বানুমানযোগ্য এবং রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার জন্য।
বিদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে রোগ নির্ণয়, বিশেষজ্ঞ মতামত, অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং এবং ফলো-আপ একই ব্যবস্থার আওতায় সম্পন্ন হয়। রোগী ও স্বজনরা শুরু থেকেই একটি স্পষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং সময়সূচি সম্পর্কে ধারণা পান।
বাংলাদেশে দক্ষ চিকিৎসক এবং আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে এই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রোগীদের আস্থাকে প্রভাবিত করে।
আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় সংকট
চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগীর আস্থা নিজেই চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চিকিৎসকের দক্ষতা, হাসপাতালের পরিবেশ, তথ্যের স্বচ্ছতা, সময়মতো সেবা, সম্মানজনক আচরণ এবং চিকিৎসা-পরবর্তী যোগাযোগ সব কিছু মিলিয়েই এই আস্থা তৈরি হয়।
যখন রোগী মনে করেন যে বিদেশে গেলে তিনি অধিক সংগঠিত সেবা পাবেন, তখন তিনি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতেও প্রস্তুত থাকেন। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে মানুষ চিকিৎসার জন্য নয়, বরং একটি নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বিদেশে যান।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় সমন্বয়ের প্রয়োজন
বাংলাদেশে একই রোগের জন্য অনেক রোগীকে একাধিক হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হয়। একই পরীক্ষা বারবার করতে হয়। এতে সময়, অর্থ এবং মানসিক চাপ—সবই বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান বিশ্বে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, অঙ্গ প্রতিস্থাপন কিংবা জটিল রোগের ক্ষেত্রে বহুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলের (Multidisciplinary Team) যৌথ সিদ্ধান্তকে সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এই পদ্ধতির প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার জরুরি।
সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি
সরকারি হাসপাতালগুলো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
অনেক চিকিৎসককে প্রতিদিন শতাধিক রোগী দেখতে হয়। ফলে প্রতিটি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, বিস্তারিত কাউন্সেলিং, চিকিৎসার বিকল্প ব্যাখ্যা এবং ফলো-আপ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এটি চিকিৎসকদের দক্ষতার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
আন্তর্জাতিক মানের একাডেমিক মেডিকেল সেন্টার গড়তে হবে
বিশ্বের শীর্ষ হাসপাতালগুলো শুধু চিকিৎসা দেয় না; তারা শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে।
বাংলাদেশেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক মানের Academic Medical Center-এ রূপান্তর করার একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
গবেষণা ছাড়া আন্তর্জাতিক মান অর্জন সম্ভব নয়
বিশ্বমানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গবেষণানির্ভর। রোগভিত্তিক জাতীয় রেজিস্ট্রি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, ফলাফলভিত্তিক গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যবিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশীয় চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও সহজ হবে।
দক্ষ মানবসম্পদই আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার মূল শক্তি
একটি আধুনিক হাসপাতাল শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে না। বিশেষায়িত নার্স, পারফিউশনিস্ট, ক্যাথল্যাব টেকনোলজিস্ট, নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ—সবাই মিলে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
এই মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া আন্তর্জাতিক মান অর্জন সম্ভব নয়।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি
ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্যভান্ডার, টেলিমেডিসিন, টেলি-প্যাথোলজি, টেলি-রেডিওলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত-সহায়ক প্রযুক্তি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এর মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমবে, রোগীর চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং রেফারেল ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশ জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসাজনিত ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিতে পড়ে।
ধাপে ধাপে একটি কার্যকর জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করা গেলে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমবে, উন্নত চিকিৎসা অধিক মানুষের নাগালে আসবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যও হ্রাস পাবে।
উত্তরণের জাতীয় রূপরেখা
বাংলাদেশকে চিকিৎসায় আত্মনির্ভর ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে-
* বিশ্বমানের একাডেমিক মেডিকেল সেন্টার গড়ে তুলতে হবে।
* প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক, কিডনি ও ট্রমা চিকিৎসার ঈবহঃবৎ ড়ভ ঊীপবষষবহপব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
* উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
* সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক স্বীকৃতি, নিয়মিত ক্লিনিক্যাল অডিট এবং রোগীর সন্তুষ্টি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
* গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
* চিকিৎসা শিক্ষায় আধুনিক কারিকুলাম, সিমুলেশন প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
* হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
* চিকিৎসা-সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান ও স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
শুধু রোগী বিদেশে যাওয়া কমানো নয় বাংলাদেশকে মেডিকেল ট্যুরিজমের গন্তব্যও হতে হবে।
ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং তুরস্ক পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসাসেবাকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের রয়েছে দক্ষ চিকিৎসক, আন্তর্জাতিক মানের ওষুধশিল্প, প্রতিযোগিতামূলক চিকিৎসা ব্যয় এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান।
সঠিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবা প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রোগীদের জন্যও বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
উপসংহার
স্বাস্থ্যখাত কোনো ব্যয়ের খাত নয়; এটি একটি কৌশলগত জাতীয় বিনিয়োগ। একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানুষের জীবন রক্ষা করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। বিরল ও অত্যন্ত জটিল কিছু রোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হবে। তবে অধিকাংশ হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি, নিউরোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, অর্থোপেডিকস এবং অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসা যদি আন্তর্জাতিক মানে দেশেই নিশ্চিত করা যায়, তবে দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, স্বাস্থ্যখাতে নতুন বিনিয়োগ সৃষ্টি হবে এবং জনগণের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণায় বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সর্বোপরি রোগীকেন্দ্রিক সেবার সংস্কৃতি। এই ভিত্তির ওপরই গড়ে উঠতে পারে একটি আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক ও বিশ্বমানের বাংলাদেশি স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস(ডিএমসি)এমডি(কার্ডিওলজি),
ক্লিনিক্যাল এন্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি, বিভাগীয় প্রধান- কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল।
