ড. এম জহির ছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ

মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

ড. এম জহির ছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ

ফন্ট সাইজ:

ড. এম জহির ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও কোম্পানি আইন বিষয়ে বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের লিডিং জুরিস্ট। সক্রিয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। কিন্তু জাতির সংকটকালীন সময়ে দলনিরপেক্ষভাবে বলিষ্ঠ ও সাহসিকতার সাথে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন। নানা বিষয়ে তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। উপমহাদেশে কোম্পানি আইনে তার সমকক্ষ আইনজীবী বিরল। কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়ে সরকারের কোম্পানি আইন সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ড. এম জহিরের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২২ মে পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগণার ভবানীপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে তিনি পরিবারের সঙ্গে কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। বেড়ে উঠেন পুরান ঢাকার নারিন্দায়। তাঁর পিতা মুহাম্মদ আসির ছিলেন পাকিস্তান আমলে ঢাকা হাইকোর্টের খ্যাতিমান বিচারপতি। আর তাঁর মাতা মরহুমা হোসনে আরা আসির ছিলেন একজন দরদী সমাজসেবী বিদুষী নারী। তিনি তাঁর পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন।

ড. এম জহির সেন্ট গ্রেগোরী স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৯ম স্থান অধিকার করে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট অব আর্টস (আইএ) পাশ করেন। ইন্টারমিডিয়েটেও পূর্ব পাকিস্তানের সম্মিলিত মেধায় তার স্থান ছিলো দশের মধ্যে। ড. এম. জহির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (সম্মান) ও এমএ এবং পরে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে আইন প্র্যাকটিস শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলএম ডিগ্রিও অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে ইংলিশ বার পাশ করে ১৯৬৫ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত লিংকন্স ইন থেকে ব‍্যারিস্টার হোন।

পিএইচডি করতে ড. এম জহির লন্ডনে যান এবং পরবর্তীতে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে কোম্পানি আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হোন। ড. এম. জহির তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ড. এম. জহির অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর হেড অব চ‍্যাম্বার ছিলেন। এর আগে ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে এবং অল্প সময়ের জন্য নিউ সাউথ ওয়েলস ল’ রিফর্ম কমিশনের জন্য কাজ করেছেন। প্যারিসের কোর্ট অব আরবিট্রেশন অ্যাট দ্য ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কর্মাসের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৪ সালের দিকে গঠিত জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. এম জহির।

আইন পেশার পাশাপাশি টানা বিশ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে কোম্পানি আইন বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। বাংলাদেশের প্রায় সব বার এসোসিয়েশনে তাঁর ছাত্র রয়েছেন। তাঁর লেখা কোম্পানি আইনের ডাউস সাইজের ‘Company and Securities Laws’ শিরোনামের বইটি বিচারক ও আইনজীবীদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। এটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সট বুক ও রিকোমেন্ডেড বই হিসেবে পড়ানো হয়। এছাড়া ড. এম জহির দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি পত্রিকার উপদেষ্টা ছিলেন।

বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন ড. এম. জহির। আহসানিয়া মিশনের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। প্রতিভাবান এই শীর্ষ আইনজীবী ব্যক্তি জীবনে ছিলেন সংস্কৃতিমনা। গান ছিল তাঁর অবসরের সঙ্গী। চমৎকার পিয়ানো বাজাতেন। টেনিস খেলাতেও পারদর্শী ছিলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘গিটার আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা। পৃথিবীর সব কাজ থেকে যখন আমি বিচ্ছিন্ন থাকি তখন কেবল গানই আমার প্রাণ হয়ে ওঠে’।
ড. এম জহিরের সাথে আমার চমৎকার সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। মৃত্যুর প্রায় বছর খানেক আগে ড. এম জহির লন্ডন সফরে এলে তিনি আমার চেম্বার পরিদর্শনে আসেন। এ সময় তাঁর সাথে একান্ত আলাপে আমি বেশ কিছু বিষয় তাঁর সদয় দৃষ্টিগোচর করি। এর মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে ‘বাংলা’ ভাষা প্রবর্তনের সম্ভাবনা। তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নাজির, শুনো, তিনটি কাজ বাংলায় করা যায় না: বাংলায় নামাজ পড়া যায় না, বাংলায় কোম্পানি ল’ হয় না এবং বাংলায় সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় না।’

তাঁর এই বক্তব্যের পেছনে জোরালো যুক্তি রয়েছে। সম্ভবতঃ এর একটি কারণ হলো, কোনো দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রায়শই বিশ্বজুড়ে উদ্ধৃত বা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ স্বরূপ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম ও শুনানিতে প্রায়ই অতীতের যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব লর্ডস’ বর্তমানের ইউকে সুপ্রিম কোর্ট, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট, অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিম কোর্ট এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলোর উল্লেখ করা হয়। উচ্চ আদালতের সাবমিশনে ঐসব দেশের রায়গুলো নজির হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে, আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের রায়গুলো যাতে বিদেশের সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রমে উদ্ধৃত হতে পারে, সেজন্য সেগুলোর গুণগত মানও সেই পর্যায়ের হতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, রায়টি যদি বাংলায় লেখা হয়, তবে কি তা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং বিদেশে কি তার উল্লেখ বা রেফারেন্স দেয়া সম্ভব হবে? তাছাড়া সামগ্রিকভাবে আইনের এবং বিশেষ করে কোম্পানি আইনের অনেক ইংরেজি শব্দের সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ বের হয়নি বা বাংলা শব্দ বললে বরং জনগণের কাছে তা হবে দুর্ভেদ্য।

ড. এম জহির সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও প্রাণচঞ্চল ছিলেন। তাঁর সেন্স অব হিউম্যার ছিল প্রবল। ৫০ বছর ধরে আইন অঙ্গনে বিচরণ করেছেন, দক্ষতা ও সুনামের সাথে আইন প্র‍্যাকটিস করেছেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৩ সালের ১১ জুলাই থাইল্যান্ডের ব‍্যাংকক জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন ড. এম জহির। তাঁর বয়স হয়েছিল তখন ৭৪ বছর। আজ তাঁর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমি এই গুণী ব‍্যক্তির আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন