বিশ্বকাপের শেষ আটের লড়াইয়ে আজ যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স এবং আফ্রিকার শেষ প্রতিনিধি মরক্কো। এটি শুধু একটি কোয়ার্টার ফাইনাল নয়; ইতিহাস, অভিবাসন, পরিচয়, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং নতুন বিশ্ব ফুটবল শক্তির উত্থানের প্রতীকী এক সংঘর্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই বোঝা যায়, ম্যাচটি ঘিরে উত্তেজনা কতটা তুঙ্গে। আফ্রিকা, আরব বিশ্ব এবং বহু মুসলিম সমর্থক মরক্কোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী ঐতিহ্য, তারকা এবং ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে ফ্রান্সকে সমর্থন করছেন। ফলে ম্যাচটি দুই দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক আবেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তবে মাঠে নামার আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছে মরক্কো। দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার ও চলতি বিশ্বকাপে অন্যতম সেরা পারফর্মার ইসমায়েল সাইবারি হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে এই ম্যাচে খেলতে পারছেন না। রাউন্ড অব ১৬-এ কানাডার বিপক্ষে চোট পাওয়া ২৫ বছর বয়সী এই ফুটবলার বিশ্বকাপে মরক্কোর আক্রমণভাগের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন। মরক্কোর প্রধান কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি নিশ্চিত করেছেন, সাইবারি পুরোপুরি ছিটকে গেছেন। তাঁর ভাষায়, "সাইবারি ছাড়া দলের অন্য সবাই শতভাগ ফিট। এই ম্যাচে সে খেলতে পারছে না।"
সাইবারির অনুপস্থিতি কেবল একজন খেলোয়াড়ের অভাব নয়; এটি মরক্কোর কৌশলগত পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে। চলতি মৌসুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে নেদারল্যান্ডসের পিএসভি আইন্দহোভেন থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরোতে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিয়েছেন তিনি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বিশ্বকাপে বড় তারকাদের বাইরে সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলারদের একজন ছিলেন সাইবারি।
তবে মরক্কোকে কখনোই একজন খেলোয়াড়ের দল বলা যায় না। এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত রক্ষণ, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং দলগত ফুটবল। সেই কারণেই সাইবারি না থাকলেও তারা যে ফ্রান্সকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে ফ্রান্সের শক্তির জায়গা তাদের অভিজ্ঞতা, গভীর স্কোয়াড এবং বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর সক্ষমতা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, অরেলিয়ান চুয়ামেনি, উইলিয়াম সালিবা কিংবা মাইক মেনিয়াঁ প্রতিটি বিভাগেই বিশ্বমানের ফুটবলার রয়েছে। কিন্তু এই দলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের অনেক খেলোয়াড়ের পারিবারিক শিকড় আফ্রিকায়। ফলে আজকের ম্যাচটি শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, অনেকের কাছে নিজের শিকড়ের বিপক্ষেও এক প্রতীকী লড়াই।
মরক্কোও এই বাস্তবতা থেকে আলাদা নয়। তাদের অনেক ফুটবলার ইউরোপে জন্মেছেন বা বেড়ে উঠেছেন। ইউরোপীয় একাডেমিতে গড়ে ওঠা এই প্রজন্ম আজ মরক্কোর জার্সিতে ইতিহাস লিখছে। তাই এই ম্যাচকে "সভ্যতার সংঘাত" হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি বিশ্বায়নের যুগে ফুটবলের নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোও ম্যাচটিকে উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে দেখছে। কারণ ফ্রান্সে কয়েক মিলিয়ন মরক্কান বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস। জয় কিংবা পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় বড় জনসমাগম হতে পারে! এমন আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানী প্যারিস থেকে শুরু করে লিয়োঁ, মার্সেই ও অন্যান্য বড় শহরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ফুটবলের দৃষ্টিতে ম্যাচটির গুরুত্ব আরও গভীর। ফ্রান্স জিতলে তারা আবারও প্রমাণ করবে যে ইউরোপীয় ফুটবলের ধারাবাহিক আধিপত্য এখনো অটুট। কিন্তু মরক্কো যদি জেতে, সেটি হবে শুধু একটি জয় নয়; আফ্রিকান ফুটবলের আত্মবিশ্বাস, আরব বিশ্বের গর্ব এবং বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ফুটবল ইতিহাসে কিছু ম্যাচ স্কোরলাইনের জন্য নয়, প্রতীকের জন্য বেঁচে থাকে। ফ্রান্স–মরক্কো ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ। এখানে একদিকে রয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে স্বপ্ন দেখা এক মহাদেশের আকাঙ্ক্ষা। একদিকে প্রতিষ্ঠিত শক্তি, অন্যদিকে নতুন সম্ভাবনার জোয়ার।
আজ বোস্টনের মাঠে নব্বই মিনিটের লড়াই শেষে একটি দল সেমিফাইনালে উঠবে। কিন্তু ফল যাই হোক, এই ম্যাচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, কারণ এটি কেবল ফুটবল নয়; এটি অভিবাসনের গল্প, ঔপনিবেশিক অতীতের প্রতিফলন, বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বাস্তবতা এবং নতুন বিশ্ব ফুটবলের আত্মপ্রকাশের এক জীবন্ত দলিল।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই সাইবারিকে হারিয়েও কি মরক্কো ইতিহাস লিখবে, নাকি ফরাসি নীল আবারও প্রমাণ করবে কেন তারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তি? উত্তর মিলবে বোস্টনের সবুজ ঘাসে। আর সেই উত্তরই হয়তো বিশ্বকাপের পরবর্তী ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
