ঢাকা মেডিকেল কলেজ: ৮০ বছরের গৌরবগাঁথা, জাতীয় ঐতিহ্য এবং বিশ্বমানের চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ার প্রত্যয়

ঢাকা মেডিকেল কলেজ: ৮০ বছরের গৌরবগাঁথা, জাতীয় ঐতিহ্য এবং বিশ্বমানের চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ার প্রত্যয়

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ সর্বাগ্রে। ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান গত ৮০ বছরে শুধু দক্ষ চিকিৎসকই গড়ে তোলেনি; ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, জাতীয় দুর্যোগ এবং বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জাতির আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সম্মান নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও পেশাগত উৎকর্ষের জাতীয় স্বীকৃতি।

জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ
বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পদচিহ্ন অম্লান।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে এই ক্যাম্পাস ছিল প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের কেন্দ্র। ভাষা শহীদদের রক্তে রঞ্জিত এই প্রাঙ্গণেই নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার, যা আজ বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের চিরন্তন প্রতীক।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। শিক্ষক, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কৃতী শিক্ষার্থী শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের আত্মত্যাগ গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর আত্মদান চিকিৎসক সমাজের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক সাহসের প্রতীক হয়ে আছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশব্যাপী অস্থিরতার সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিপুলসংখ্যক আহত মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে জরুরি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন। এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দুর্যোগ ও গণ-আহত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী ট্রমা সেন্টার, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

আমরা কেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চাই?
ডিএমসি-ডে উপলক্ষে গত দুই সপ্তাহে আমি কয়েকজন সিনিয়র ও জুনিয়র চিকিৎসককে একটি প্রশ্ন করেছিলাম
“আপনি বা আপনার পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনে কি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন?” তাদের অধিকাংশের উত্তর ছিল “না।” এই উত্তর কোনো ব্যক্তির সমালোচনা নয়; বরং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার সুযোগ।
আমরা এমন একটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চাই না, যেখানে দেশের চিকিৎসকরাই নিজেদের বা পরিবারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে পূর্ণ আস্থা অনুভব করতে দ্বিধাবোধ করেন।

আমরা এমন একটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চাই-
* যেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, কৃষক, শ্রমিক সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ সমান আস্থা নিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করবেন।
* যেখানে আন্তর্জাতিক মানের রোগীর নিরাপত্তা, মানবিক সেবা ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত হবে।
* যেখানে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশে কাজ করবেন।
* যেখানে কোনো রোগী চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাবেন না।
* যেখানে চিকিৎসা হবে দ্রুত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর।
একটি উন্নত দেশের পরিচয় কেবল উন্নত অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং এমন একটি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায়, যেখানে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও নির্ভয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং সাধারণ মানুষও একই মানের সেবা পান।

বিশ্বমানের ঢাকা মেডিকেল কলেজ গড়তে করণীয়
ঢাকা মেডিকেল কলেজকে একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক চিকিৎসাকেন্দ্রে (Academic Medical Center) রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন-
* সম্পূর্ণ ডিজিটাল হাসপাতাল ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যনথি।
* কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা সিদ্ধান্ত সহায়ক প্রযুক্তি।
* আন্তর্জাতিক মানের ট্রমা সেন্টার, স্ট্রোক সেন্টার, হৃদ্রোগ কেন্দ্র, ক্যানসার কেন্দ্র ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন কেন্দ্র।
* আধুনিক গবেষণাগার, জিনোম গবেষণা, চিকিৎসা উদ্ভাবন ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার প্রসার।
* দক্ষতাভিত্তিক চিকিৎসা শিক্ষা, অনুকরণভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতা।
* রোগীর অধিকার, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, মাননিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
* চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন।

ভিশন-২০৪৬: শতবর্ষের ঢাকা মেডিকেল কলেজ
প্রতিষ্ঠার শতবর্ষে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা, যা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
আমাদের স্বপ্ন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, মানবিকতা ও আধুনিক প্রযুক্তি একসূত্রে গাঁথা থাকবে এবং প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা ও আস্থা নিয়ে চিকিৎসাসেবা পাবেন।

উপসংহার
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০ বছরের ইতিহাস আমাদের গৌরবের, স্বাধীনতা পুরস্কার আমাদের সম্মানের, আর আগামী শতবর্ষ আমাদের দায়িত্বের। ডিএমসি-ডে উপলক্ষে আমরা প্রত্যাশা করি, এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যকে ধারণ করে চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সুশাসন এবং মানবিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। জাতীয় ঐকমত্য, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজকে এমন এক বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক চিকিৎসাকেন্দ্রে উন্নীত করা সম্ভব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গর্বের প্রতীক হয়ে থাকবে। যেদিন দেশের একজন সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, চিকিৎসক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সমান আস্থা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন, সেদিনই আমরা বলতে পারব ঢাকা মেডিকেল কলেজ তার ঐতিহাসিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সত্যিকারের বিশ্বমানের চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), কে-৪৬, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন