রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনই ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা বা যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে রাজি নন। বরং সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার, বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি যুদ্ধ আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি সূত্র জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়ালেও পুতিন আপাতত সংঘাত আরও বাড়ানোর দিকেই ঝুঁকছেন। এর মধ্যে একজন, যিনি নিয়মিত পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তিনি বলেছেন যে, আগামী কয়েক মাসে যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা “খুবই বেশি”।
এ তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার বলেছেন, পুতিন যুদ্ধের অবসান চান এবং শান্তি চুক্তি “মানুষের ধারণার চেয়েও কাছাকাছি”।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প পৃথকভাবে পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পরে ন্যাটো সম্মেলনে জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাতে তারা যুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করার বিভিন্ন ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন।
তবে রয়টার্সের একটি সূত্র বলছে, পুতিন এখনো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাসের পুরো অঞ্চল দখলকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। ওই সূত্রের দাবি, সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি এবং বর্তমান ফ্রন্টলাইন ধরে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া কয়েকজন উপদেষ্টাকে ভর্ৎসনাও করেছেন তিনি।
আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, পুতিনের বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতেই রাশিয়া ডনবাস পুরোপুরি দখল করতে সক্ষম হবে। গত জুন মাসে জেলেনস্কি সরাসরি বৈঠক ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও তা প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেন পুতিন।
এ বিষয়ে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে স্বাধীনভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে।
অন্যদিকে জেলেনস্কির কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইউক্রেনের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী পুতিন শান্তির জন্য নয়, বরং নতুন সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনকি ইউক্রেনের বাইরে ইউরোপের অন্য কোনো দেশেও হামলার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ডনবাস দখল করতে হলে রাশিয়াকে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ (কনস্ক্রিপশন) চালু করতে হতে পারে। তবে রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হওয়ায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে এতদিন অনীহা দেখিয়ে আসছেন পুতিন।
এদিকে রাশিয়ার কয়েকজন সামরিক বিশ্লেষক প্রকাশ্যেই ন্যাটোর লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সম্ভাবনার কথা বলছেন। তাদের মতে, বাল্টিক অঞ্চলের ন্যাটো ঘাঁটি কিংবা ইউরোপে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র উৎপাদনকারী স্থাপনাগুলো ভবিষ্যতে হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) সামরিক বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলেন, রাশিয়ার উদ্দেশ্য সরাসরি ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করা নয়। তবে সীমিত হামলার মাধ্যমে জোটটির সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হতে পারে।
যুদ্ধের খরচ বাড়ছে, জ্বালানি সংকটে রাশিয়া
ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়া ও রুশ-অধিকৃত ইউক্রেনের তেল শোধনাগার, বন্দর এবং জ্বালানি সংরক্ষণাগারে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং যুদ্ধের প্রভাব এখন সাধারণ রুশ নাগরিকরাও অনুভব করছেন।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রথমবারের মতো পুতিনের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে, যদিও তার সামগ্রিক জনসমর্থন এখনো তুলনামূলকভাবে উচ্চ।
রয়টার্সের একটি সূত্রের দাবি, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক সাফল্য পুতিনকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে এবং তিনি এর কঠোর জবাব দিতে বদ্ধপরিকর।
গত এক সপ্তাহে রাশিয়া কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যদিও মস্কোর দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক স্থাপনা।
গত সপ্তাহে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে পুতিন বলেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জবাবে রাশিয়া সীমান্তবর্তী আরও ইউক্রেনীয় এলাকা দখল করে একটি “নিরাপত্তা অঞ্চল” গড়ে তুলবে।
রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আন্দ্রেই ইলনিতস্কি সম্প্রতি কোমেরসান্ত পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করেন, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইউক্রেনের অন্তত ৩০টি বড় শিল্পকারখানা, ইস্পাত কারখানা এবং ওডেসা বন্দরে হামলা চালানো হতে পারে। এরপর বাল্টিক দেশ ও রোমানিয়ায় ন্যাটো ঘাঁটি এবং ইউক্রেনের জন্য দূরপাল্লার অস্ত্র উৎপাদনকারী ইউরোপীয় স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
এ বিষয়ে দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউরোপের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণের বাস্তবতায় রাশিয়া নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য।
ডনবাসে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ
বিশ্লেষকদের মতে, ডনবাস দখলের লড়াই এখন দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ সেনা নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখই রুশ সেনা।
ইউক্রেনের ড্রোন প্রতিরোধের কারণে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনে এ বছর রাশিয়ার অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দোনেৎস্ক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাবেষ্টিত শহর কস্তিয়ানতিনিভকার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে রুশ বাহিনী।
গত ৩ জুলাই পুতিন দাবি করেন, রাশিয়া শহরটি দখল করেছে। তবে ইউক্রেন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এর একদিন পর ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে পুতিন বলেন, দোনেৎস্ক অঞ্চলের ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবশিষ্ট অংশও রাশিয়া দখল করবে।
ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের ভাষায়, পুতিনের কাছে ডনবাস দখল নীতিগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তার মতে, পুতিনের এখন অন্তত একটি বড় বিজয় প্রয়োজন।
