রক্তস্নাত জুলাই:, কায়েমি স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ইতিহাসের অমোঘ পুনরাবৃত্তি

রক্তস্নাত জুলাই:, কায়েমি স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ইতিহাসের অমোঘ পুনরাবৃত্তি

ফন্ট সাইজ:

কালস্রোত এক নির্দয় ও নিরপেক্ষ বিচারক; সে কোনো সাময়িক আবেগকে প্রশ্রয় দেয় না, কেবল নিরেট ও নির্মোহ সত্যকে ইতিহাসের শিলালিপিতে খোদাই করে রাখে। আজ চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হতে চলেছে। যে জুলাইয়ের উত্তাল রাজপথে অগণিত তরুণের তপ্ত রক্তে লেখা হয়েছিল এক নতুন বাংলাদেশের মহাকাব্যিক ইশতেহার, যে গণবিস্ফোরণের প্রবল জলোচ্ছ্বাসে পতন ঘটেছিল এক জগদ্দল স্বৈরাচারের, সেই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজ আমরা এক নিদারুণ রাজনৈতিক মোহভঙ্গের ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছি। একটি স্বাধীন, সাম্যভিত্তিক, ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের যে নৈসর্গিক স্বপ্ন নিয়ে হাজারো ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, আজ সেই স্বপ্নের ভস্মস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা কেবলই প্রত্যক্ষ করছি চিরাচরিত ক্ষমতার এক রুঢ় পালাবদল।

রাষ্ট্রক্ষমতার হাতবদল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামোর কোনো দৃশ্যমান বা গুণগত রূপান্তর ঘটেনি। স্বৈরাচারের পতন হলেও শাসনতান্ত্রিক দর্শনের কোনো মৌলিক ব্যত্যয় হয়নি। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর রাষ্ট্রযন্ত্রে যে বিশাল অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল জাতি পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ। রাজপথের অকুতভয় ছাত্র-জনতার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রের আমূল ও কাঠামোগত সংস্কার। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, পুলিশ, বিচারবিভাগ, প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে, বিবাদমান নানা পক্ষ কেবল নিজ নিজ কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করতেই মত্ত হযে উঠল। প্রত্যেকেই চেয়েছে ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোকে মেরামত বা স্বাধীন করার বদলে নিজেদের রাজনৈতিক ঢাল ও তলোয়ার হিসেবে কুক্ষিগত করতে। আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অস্থিমজ্জায় মিশে থাকা ক্ষমতালিপ্সা এবং ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর এই তীব্র অস্থিরতা-রাষ্ট্র সংস্কারের সেই পবিত্র স্পৃহাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। ফলশ্রুতিতে, পূর্ববর্তী স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ত্রুটিপূর্ণ ও ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ক্ষমতার এক মহারণ শুরু হয়। যে স্নিগ্ধ পরিবেশে একটি সুস্থ, শক্তিশালী ও বহুদলীয় প্রতিযোগিতার ভিত তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে কেবল আধিপত্য বিস্তারের এক নির্লজ্জ ও পেশিশক্তিনির্ভর লড়াই পরিলক্ষিত হলো। জনমতের নিখুঁত ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিফলনের বদলে রাজনৈতিক বাহুবল এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নতুন শাসনব্যবস্থার অবয়ব দাঁড় করানো হলো। কেবল কোনো একক গোষ্ঠী বা দলের দায় নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমের চরম ও ঐতিহাসিক ব্যর্থতা, যেখানে ক্ষমতাকে জনতার সেবার হাতিয়ার না ভেবে কেবলই নিজেদের গোষ্ঠিস্বার্থ ও নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের মোক্ষম চাবিকাঠি বলে গণ্য করা হয়।

বিপ্লব কখনো শূন্যগর্ভ থেকে উৎসারিত হয় না, আবার বিপ্লব একা একা তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতেও পারে না। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা, গুম, খুন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ। শহীদ আবু সাঈদের প্রসারিত বুক কিংবা মুগ্ধর সেই ব্যাকুল ও চিরন্তন আহ্বান-”পানি লাগবে, পানি?” এই দৃশ্যপটগুলো কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ইশতেহার থেকে জন্ম নেয়নি। এগুলো ছিল প্রান্তিক, শোষিত ও সাধারণ মানুষের মুক্তির এক ঐশ্বরিক আকুতি। কিন্তু অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরেই আমরা অবলোকন করলাম রাজনৈতিক এলিট শ্রেণির সুবিধাবাদের বীভৎস আস্ফালন। যে রাজনৈতিক কাঠামো দীর্ঘকাল ধরে রাজপথের আন্দোলনে বারবার হোঁচট খেয়েছে ও আপস করেছে, স্বৈরাচারের পতনের পর তারাই অবতীর্ণ হলো বিপ্লবের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে। ছাত্র-জনতার কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো বা ছকবাঁধা সংগঠন ছিল না। তাদের অন্তরে ছিল একটি প্রদীপ্ত ভিশন, কিন্তু সেই ভিশন বাস্তবায়নের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি বা চাতুর্য তাদের ছিল না। এই শূন্যতারই নির্লজ্জ সুযোগ নিয়েছে চিরাচরিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো। তারা তাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শক্তির জাঁতাকলে শূন্যস্থান পূরণ করেছে এবং অভ্যুত্থানের সার্বজনীন ও পবিত্র ন্যারেটিভকে হরণ করে নিজেদের দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ন্যারেটিতে রূপান্তরিত করেছে। যারা রাজপথে রক্ত দিল, তারা রয়ে গেল ইতিহাসের অখ্যাত ফুটনোটে; আর বিবাদমান পক্ষগুলো মেতে উঠল ক্ষমতার উদ্দিষ্ট ও হালুয়া-রুটি ভাগাভাগির এক উল্লাসে।

বিশ্বইতিহাসের বিস্তৃত ক্যানভাসের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা দেখতে পাব, বাংলাদেশের এই বর্তমান পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিপ্লব-পরবর্তী মোহভঙ্গের এক দীর্ঘ, রক্তাক্ত ও করুণ ইতিহাস মানবসভ্যতায় বিদ্যমান। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রেন ব্রিনটন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য অ্যানাটমি অব রেভোলিউশন’-এ সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, প্রতিটি বিপ্লবের পর একটি প্রতিবিপ্লবী বা সুবিধাবাদী প্রতিক্রিয়া (ঞযবৎসরফড়ৎরধহ জবধপঃরড়হ) অবশ্যম্ভাবী রূপে আবির্ভূত হয়। বিপ্লবের চরম আদর্শিক ও রোমান্টিক পর্যায়টি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না; সুসংগঠিত এবং সুবিধাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো বিপ্লবের ফসল সুকৌশলে নিজেদের গোলায় তুলে নেয়। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ায় যখন জারতন্ত্রের পতন ঘটে, তখন সেটি ছিল সাধারণ কৃষক ও শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বলশেভিকরা সেই বিপ্লবের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। তারা আপামর জনতাকে সাম্যের স্বপ্ন দেখালেও ধীরে ধীরে ক্ষমতাকে চরমভাবে কেন্দ্রীভূত করে নতুন ধরনের একনায়কতন্ত্রের জন্ম দেয়। স্বৈরাচারের পতনের পর বাংলাদেশেও সামগ্রিক সংস্কারের বদলে বিবাদমান গোষ্ঠীগুলোর এই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিরই করুণ প্রতিধ্বনি।

একইভাবে আমরা যদি ২০১১ সালের আরব বসন্তের দিকে ফিরে তাকাই, তবে সেখানেও আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি ভাস্বর হয়ে ওঠে। মিসরের তাহরির স্কয়ারে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর তরুণ প্রজন্ম যখন এক নতুন ও আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুনছিল, ঠিক তখনই সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হস্তগত করে। রাষ্ট্রকাঠামোর গুণগত সংস্কারের বদলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করতে গিয়ে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার সুযোগে পুরনো অগণতান্ত্রিক ও সামরিক শক্তি পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ফরাসি বিপ্লবের প্রলয়ংকারী ঝড়ের পরও চরমপন্থীদের হাত ঘুরে ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছিল ‘ডিরেক্টরি’ নামক একটি দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত পর্ষদের হাতে। তারা বিপ্লবের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে কেবল বিদ্যমান শোষণমূলক কাঠামো টিকিয়ে রাখতেই ব্রতী ছিল। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক চালচিত্রও এই অমোঘ সত্যটিই প্রমাণ করে যে, কেবল শাসকের পরিবর্তন হলেই সমাজের মুক্তি আসে না, যদি না বিবদমান পক্ষগুলো নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শাসনব্যবস্থার আমূল ও কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন করতে পারে।

ফ্যাসিবাদ কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা একটি দলের নামান্তর নয়; ফ্যাসিবাদ হলো একটি মজ্জাগত সিস্টেম বা নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা। বিগত স্বৈরাচারী সরকার যে নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করেছিল, আজ দুই বছর পর নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই দানবীয় যন্ত্রটিকে ভাঙতে তো পারেইনি, বরং জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সেই একই কাঠামোর ওপর নির্লজ্জভাবে নির্ভর করছে। যে পুলিশ বাহিনী জুলাই মাসে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছিল, সেই পুলিশ কাঠামোর কোনো মৌলিক বা গুণগত সংস্কার আজও অধরা। প্রশাসনযন্ত্র রাতারাতি নিজেদের খোলস পাল্টে নতুন রাজনৈতিক পক্ষের বন্দনায় লিপ্ত হয়েছে এবং নতুন বাস্তবতার সাথে অত্যন্ত সুচারুভাবে আপস করেছে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ার যে বজ্রকঠিন দাবি ছিল, তা বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের সংঘাতে ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে চিরতরে হারিয়ে গেছে। বিগত সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতিকে অক্টোপাসের মতো পেঁচিয়ে ধরেছিল মুষ্টিমেয় কয়েকজন অলিগার্ক বা লুটেরা পুঁজিপতি। বিপ্লবের পর সাধারণ মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল এই লুণ্ঠনতন্ত্রের চির অবসান ঘটবে। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতায় দেখা গেল, পুরনো সিন্ডিকেটের হাতবদল হয়েছে মাত্র; বাজার থেকে এর বিষাক্ত প্রভাব বিন্দুমাত্র দূরীভূত হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সুবিধাবাদীদের কেবল মুখোশ পাল্টেছে, মূল চরিত্র রয়ে গেছে আগের মতোই। বিচারবিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত করার কোনো দৃশ্যমান, অকাট্য কাঠামো এই দুই বছরে দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি, কারণ প্রতিটি বিবাদমান পক্ষই প্রচ্ছন্নভাবে চেয়েছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেন তাদের নিজস্ব ইশারায় ও অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত হয়।

ফ্যাসিবাদ পতনের সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি হলো, সমাজ থেকে অসহিষ্ণুতার বিষবাষ্প দূর না হওয়া। প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নিটশে যথার্থই বলেছিলেন, “যে দানবের সাথে লড়াই করে, তার খেয়াল রাখা উচিত সে যেন নিজেই দানবে পরিণত না হয়।” আজকের বাংলাদেশে আমরা এক নতুন সামাজিক অসহিষ্ণুতার লেলিহান শিখা প্রত্যক্ষ করছি। সমাজ চরমভাবে মেরুকৃত ও খণ্ডিত। কেউ সামান্য ভিন্নমত পোষণ করলেই তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করার বা বিভিন্ন নেতিবাচক ট্যাগ দেয়ার যে বিষাক্ত প্রবণতা, তা সমাজে এক ভীতিকর ও শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা তৈরি করেছে। পরমতসহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আকাল কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেই নয়, বরং সমগ্র সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ক্যান্সারের মতো প্রবেশ করেছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুত্ববাদী সমাজ গড়ার বদলে আমরা যেন নতুন করে বিভেদের অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিচ্ছি। যে অকুতোভয় ছাত্র-জনতা বাকস্বাধীনতার জন্য লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল, আজ তাদের অনেকেই হতাশায় স্তব্ধ। কারণ, ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিবাদমান গোষ্ঠীগুলো তাদের মতাদর্শের বাইরের কোনো গঠনমূলক সমালোচনাকেও সহজে গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ করছে।

আমাদের এই জাতীয় স্থবিরতার নেপথ্যের মূল কারণগুলো অত্যন্ত গভীর এবং কাঠামোগতভাবে প্রোথিত। প্রথমত, আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চরমভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, স্তাবকতামূলক এবং ক্ষমতামুখী। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে এবং বাইরে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চার যে নিদারুণ অভাব, তা গোটা ব্যবস্থাকেই কলুষিত করে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, সুশীল সমাজের চরম মেরুকরণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব। যারা অন্ধকারের মাঝে সমাজকে পথ দেখাবে, সেই বুদ্ধিজীবীরাও আজ বিভক্ত হয়ে পড়েছেন নানা স্বার্থের সমীকরণে ও ক্ষমতার পদলেহনে। একটি নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের জন্য যে অকুতোভয় বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস ও সততা প্রয়োজন, তার বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, আমাদের মজ্জাগত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। আমরা যুগ যুগ ধরে ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছি, মজবুত প্রতিষ্ঠান গড়ায় নয়। যতদিন না আমরা শক্তিশালী, স্বাধীন ও স্বয়ংক্রিয় প্রতিষ্ঠান গড়তে পারব এবং বিবাদমান পক্ষগুলো নিজেদের সংকীর্ণ ও ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হবে, ততদিন কোনো প্রক্রিয়াই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক বা কল্যাণমুখী হতে পারবে না।

তবে আজ যে গুমোট রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কখনো নীরবে মরে যায় না, তা কেবল জমা হয় এবং একসময় আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের একটি ধ্রুব সত্য শিখিয়েছে-বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন তারা অসাধ্য সাধন করতে পারে। রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার ছাড়া, জনগণের প্রকৃত ভোটাধিকার নিশ্চিত করার একটি বাধাহীন পরিবেশ তৈরি করা ছাড়া এবং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে সমাজ গঠন ছাড়া কোনো কৃত্রিম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বিপ্লব কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে শেষ হয়ে যায় না, এটি একটি প্রবহমান ও চলমান রেখা। চব্বিশের জুলাই হয়তো আজও তার কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি, কিন্তু মানুষের অন্তরাত্মায় যে মুক্তির স্ফুলিঙ্গ একবার জ্বলে উঠেছে, তা সহসা নিভে যাওয়ার নয়। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এই রুঢ় সত্য অনুধাবন করতে হবে যে, পুরনো কায়দায়, পুরনো মানসিকতায় এবং কেবল নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ হাসিলের মাধ্যমে একটি নতুন ও আধুনিক বাংলাদেশ পরিচালনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শহীদের রক্তের দাগ কখনো মিথ্যা বলে না, আর কালস্রোত কখনো প্রতারকদের ক্ষমা করে না। আমাদের কেবল গভীর ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করতে হবে এবং নিজেদের শাণিত ও প্রস্তুত করতে হবে একটি সুদীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ও কাঠামোগত লড়াইয়ের জন্য। কারণ, মুক্তির আসল সংগ্রাম ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার এখনো বাকি; হয়তো চব্বিশের জুলাই ছিল কেবলই সেই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের এক অবিস্মরণীয় সূচনা।

লেখক: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন