ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ১৭ জুন হওয়া সমঝোতা স্মারক পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গত টানা ছয় রাত ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মার্কিন বাহিনী নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতে প্রথমবারের মতো ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে।
প্রেস টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে কয়েকটি সেতুসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার সময় সেতুগুলো দিয়ে যানবাহন চলাচল করছিল।
এদিন মার্কিন বাহিনী ইরানের বিমানবন্দর লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে। এনিয়ে প্রথমবারের মতো মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানে চালানো তাদের সর্বশেষ অভিযানে দেশটির “সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামোতে” আঘাত হানার কথা জানিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত পাঁচটি সেতুতে হামলা হয়েছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক বিমান হামলার হুমকি দেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের উপকূল বা দ্বীপাঞ্চলে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। এরপরেই দেশটিতে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার খবর এলো।
এদিকে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে হামলা জোরদার করেছে ইরানি বাহিনী। দেশটি আগেই সতর্ক করেছিল, মার্কিন বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে সবকিছু গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইরান, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী একটি কমান্ড সেন্টার, ওমানে মার্কিন রাডার স্থাপনা এবং কুয়েতে অস্ত্রের গুদাম ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থাকে নিশানা করে হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া কাতার, জর্ডান ও ইরাকেও ইরানি বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আল-জাজিরা।
সিএনএনের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সেতু, রেলওয়ে সংযোগস্থল এবং উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে মার্কিন বাহিনীর নিখুঁত হামলার ধারাবাহিকতা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এসব হামলার উদ্দেশ্য শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি হতে পারে।
ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, এসব হামলার মূল লক্ষ্য দক্ষিণাঞ্চলে ইরানি সামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহ ও চলাচলের সক্ষমতা ব্যাহত করা। তার মতে, এটি ভবিষ্যতে সম্ভাব্য স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতিরও অংশ হতে পারে।
গত এপ্রিলের দেশ দুইটির মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর এটিই সবচেয়ে তীব্র সামরিক অভিযান।
বিশ্লেষক আজিজির মতে, সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি সেতু, বিদ্যুৎ লাইন ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) রাডার ও নৌঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তার ভাষায়, এই অভিযান শুধু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি দেয়ার ইরানের সক্ষমতা হ্রাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ওয়াশিংটন সম্ভবত ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয়াকেই একমাত্র কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে।
এদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, রাডার ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনা ধ্বংসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
ডনাল্ড ট্রাম্পও এর আগে সম্ভাব্য বৃহত্তর সামরিক অভিযানের বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে প্রতিদিনই হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন ইরানি অবস্থানগুলোতে হামলা চালাচ্ছে।
এর মধ্যে গত বুধবার প্রণালির গ্রেটার তুনব দ্বীপে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপটি ইরানি সামরিক বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
