জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাস

ফন্ট সাইজ:

এ মাস জুলাই। এ মাস বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক মাস। এ মাস গণঅভ্যুত্থানের মাস। আজ গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। চব্বিশ থেকে ছাব্বিশ। দেশব্যাপী গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এই দুই বছরে দেশে অনেক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। শাসনব্যবস্থায় শূন্যতা পূরণে গঠিত হয়েছিল একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এক বছরেরও বেশি সময় তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। অভ্যুত্থানকারীদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল সেই সরকার। কিন্তু কী ছিল তাদের আকাঙ্ক্ষা, সে সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণা অনেকদিন পর্যন্ত ছিল না। কারণ অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার অনেকদিন পর পর্যন্তও তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো ঘোষণা জনগণকে দেয়া হয়নি। ছয় মাস পরে প্রকাশিত হয়েছে তাদের জুলাই সনদ।

আগে বিপ্লব, পরে বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ স্পষ্টতই একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিশ্বে যতগুলো বিপ্লব সাধিত হয়েছে, ক্ষমতা দখলের ঘটনা ঘটেছে, সবগুলোরই চরিত্র ছিল ভিন্ন। সেসব বিপ্লব হয়েছে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে, তাদের নির্দিষ্ট ঘোষণা বা লক্ষ্য অনুযায়ী। কমিউনিস্টদের বিপ্লব ছিল সাম্যবাদ কায়েম। ক্ষমতা দখল করেই তারা সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেছে, প্রশাসনকে পার্টির লক্ষ্য ও ঘোষণা অনুযায়ী গড়ে তুলেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান, যাকে অনেকেই বিপ্লব বলে দাবি করছেন, তার নেতৃত্বে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। এর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো পূর্ব ঘোষণাও ছিল না। এ অভ্যুত্থানের একটিই লক্ষ্য ছিল, হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা। হাসিনাকে উৎখাতের পর কী হবে—তা অভ্যুত্থানের আগে পরে কখনও বলা হয়নি।

জুলাই অভ্যুত্থানের সনদ ঘোষণা করা হলো অভ্যুত্থানের পুরো এক বছর পরে, হাসিনার পলায়নের বর্ষপূর্তিতে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট। প্রথমে এর অংশবিশেষ পাঠ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এবং পরে এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং এতে বিভিন্ন দলের স্বাক্ষর নেয়া হয় আরও দুই মাস পরে অক্টোবরের ১৭ তারিখে। ততদিনে অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের একটি অংশ মিলে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে ফেলেছেন। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল এই দল কি অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া লক্ষ জনতাকে সামগ্রিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করে? কারণ লক্ষ জনতার সবাই তো এই দলে নেই। নেই অনেক উল্লেখযোগ্য নেতা-নেত্রী, যারা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। লক্ষ জনতা তো নানা রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা, নানা মত ও পথের অনুসারী ছিল। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র যখন প্রকাশিত হয় তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছিল ঘোষণাটি অভ্যুত্থানকারী লক্ষ জনতার সবার নাকি যারা নতুন দল গঠন করেছেন শুধু তাদের, যারা এই সনদ বাস্তবায়ণের দাবিতে সোচ্চার।

এরই মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে সাধারণ নির্বাচন। দেশে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচনে ছিলো না। ফলে সংসদে এসেছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে। জামায়াতে ইসলামী আসন নিয়েছে বিরোধী দলে। জামায়াতে ইসলামী এবার ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। এত আসন এর আগে তারা আর কখনও পায়নি। নতুন দল এনসিপি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু এনসিপি’র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই দল পরিচিতি পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন হিসেবে।

নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ এবং নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় দেশের শাসনকার্যে এবং প্রশাসনে একটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। যদিও এখনও অভ্যুত্থান পরবর্তী অরাজকতার অবসান হয়নি, এখনও ‘মবতন্ত্রে’র কবল থেকে দেশ পুরোপুরি মুক্ত নয়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশাব্যঞ্জক উন্নতি ঘটেনি, তবুও জনগণের নির্বাচিত একটি স্থিতিশীল সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে আশাবাদী অবশ্যই হওয়া যায়।

তবে বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, এই লেখায় আমি দেশের পেরিয়ে আসা রাজনীতি নিয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই। অভ্যুত্থানকারীদের সমর্থনে গঠিত সরকারকে বলা হয়েছিল ‘অন্তর্বর্তী সরকার’। কিন্তু সাংবিধানিক কোনো অবস্থান সেই সরকারের ছিল না। ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। সে ব্যবস্থায় দেশে তিনবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম হয়েছে। সেই সব সরকারের দায়িত্ব ছিল শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এর জন্য তাদের মেয়াদ নির্ধারণ করা ছিল ৯০ দিন। ৯০ দিন মানে তিন মাস। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে তারা বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যবস্থাকে বহাল রাখা হয়নি।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে আদালতের রায়ের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বিলোপ করে দিয়ে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় করিয়ে নেয়ার পর বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে—তা তো আজ ইতিহাস। সেই সব স্বেচ্ছাচারী নির্বাচনের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থেকেছেন পনের বছরেরও বেশি সময়। চালিয়েছেন একচ্ছত্র শাসন। বন্ধ করেছেন বিরোধী মত প্রকাশের স্বাধীনতা। একনায়কতন্ত্র ও দুঃশাসনের সকল কুফল ভোগ করতে হয়েছে দেশের মানুষকে। যারই চূড়ান্ত পরিণতি হাসিনার বিরুদ্ধে ‘২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থান। পরাভূত হাসিনাকে ক্ষমতা ছেড়ে, দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।
আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ছাত্র সমাজের কোটা সংস্কারের দাবিতে। বলতেই হবে, ছাত্রদের এই দাবি নিয়ে হাসিনা যথেষ্ট মস্করা করেছেন, তাদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। ছাত্ররা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চেয়েছিল, তিনি পুরো কোটা ব্যবস্থাকেই বাতিল করে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। পরে আবার তারই গৃহীত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারই অনুগত কাউকে দিয়ে আদালতে রিট করিয়ে পুরো বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলেন। সমাধান নয়, তিনি ছাত্রদের সাথে তামাশা করেছিলেন। তারা আবার যখন নতুন করে আন্দোলনে নামল তখন তিনি তাতে ঘৃতাহুতি দিলেন একটি মন্তব্য করে, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য না করে কি রাজাকারদের নাতিপুতিদের জন্য কোটা ব্যবস্থা করব’!

হাসিনার এই মন্তব্য যে তাৎক্ষণিক বা হঠাৎ মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া এমনটি মনে করেন না পর্যবেক্ষক মহল। একজন লিখেছেন, যে চাটুকার সাংবাদিকদের নিয়ে হাসিনা মাঝে মাঝেই সাংবাদিক সম্মেলনের নাটক করতেন, সেখানে নাকি আগেই নির্ধারণ করে দেয়া হোত কে কোন প্রশ্ন করবেন। হাসিনা এইসব তথাকথিত সাংবাদিক সম্মেলনে কিছু কথা বলতে চাইতেন। সেগুলো বলার সুযোগ তৈরির জন্য ওই চাটুকার সাংবাদিকদের হাতে আগেভাগেই নির্ধারিত সব প্রশ্ন ধরিয়ে দেয়া হোত। কোটা আন্দোলন নিয়ে এই মন্তব্যটি করার জন্য তিনি মনে হয় প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। নির্ধারিত প্রশ্নটি একজনের কাছ থেকে পেয়েই তিনি মন্তব্যটি করেছিলেন।

হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন ‘তিল থেকে তাল’ হয়ে গিয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই, এর জন্য হাসিনাই এককভাবে দায়ী। সবাই জানে তার শাসনে তিনি একাই সবকিছু করতেন। তার সরকার, তার প্রশাসন, পুলিশ-র‌্যাব, সবাই ছিল তার স্তাবক। তিনি যা বলতেন বা করতেন সেটাই ছিল সবার শিরোধার্য। কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন যখন দুর্বার হয়ে উঠেছে তখন তিনি সর্বশক্তি দিয়ে তা দমনের চেষ্টা করেছেন। এটাই স্বৈরাচারের চরিত্র। তার ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ যখন দেশের আপামর মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে, ছাত্ররা যখন বুক পেতে গুলি খেয়েও পিছু হঠছে না, আন্দোলন যখন আরও জোরদার হয়ে উঠছে, যখন দলে দলে মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে, তখন এ আন্দোলন আর কোটার আন্দোলন ছিল না। হাসিনার হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে তা পরিণত হয়েছিল আপামর মানুষের এক দফার আন্দোলনে। তখন দাবি আর কোটা সংস্কার নয়, তখন দাবি হয়ে উঠেছিল হাসিনার পদত্যাগ। এই পরিস্থিতিতে হাসিনা আহ্বান জানিয়েছিলেন কোটা আন্দোলনের নেতাদের। বললেন, আলোচনার জন্য তার গণভবনের দরজা খোলা রয়েছে। তখন তার এ আবেদন ছিল অর্থহীন। মানুষ তখন আন্দোলন করছে এক দফা দাবিতে, হাসিনার পদত্যাগ। কোটা সংস্কারের দাবিতে নয়।

আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের সময় পাননি হাসিনা। তাকে জানানো হয়েছিল বিক্ষোভকারীরা সমস্ত প্রতিবন্ধকতা অগ্রাহ্য করে, সমস্ত প্রতিরোধ ব্যর্থ করে দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে গণভবনের দিকে। সময়ের হিসাবে আর পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই তারা হামলে পড়বে গণভবনে। এর আগেই তাকে গণভবন ছেড়ে পালাতে হবে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হাসিনা পালিয়েই গেলেন। পড়ে রইল তার গণভবন, তার মন্ত্রীরা, দলীয় নেতা-কর্মীরা, উপদেষ্টারা, তার প্রশাসন, তার র‌্যাব, তার পুলিশ। কাউকে কিছু জানাতেও পারলেন না। নিজের প্রাণ বাঁচাতে বোন রেহানাকে নিয়ে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে ভারতে চলে গেলেন। সেনা প্রধানের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি পালিয়ে না গেলে তার ভাগ্যে কি ঘটত কল্পনাই করা যায় না। সাম্প্রতিক এক দৃষ্টান্ত তো চোখের সামনেই রয়েছে, লিবিয়ার দীর্ঘ দিনের স্বৈরশাসক মুয়ামার গাদ্দাফির মর্মান্তিক পরিণতি।

হাসিনা পালালেন। সরকার ধসে গেল। কিন্তু আন্দোলনকারী কারও চিন্তাতেই ছিল না পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। আগেই বলেছি, এই আন্দোলন, যাকে বিপ্লব বলে অভিহিত করা হচ্ছে, তা কোনো রাজনৈতিক দল দ্বারা পরিচালিত ছিল না। এ আন্দোলন কোনো কর্মসূচিভিত্তিক ছিল না। এটি ছিল শুধুমাত্র হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে আপামর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। এ আন্দোলনে নেমে আসা মানুষদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা একরৈখিক ছিলো না। নানা মতের নানা রাজনৈতিক চিন্তাধারার মানুষ এই আন্দোলনে একাট্টা হয়ে গিয়েছিল, যেমনটি হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। যেহেতু কোনো মনোলিথিক পার্টির নেতৃত্বে সুদূরপ্রসারী কোনো বিশেষ লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচির ভিত্তিতে এ আন্দোলন সংঘটিত হয়নি, তাই একে বিপ্লব আখ্যায়িত করাকে আমি সঙ্গত বলে মনে করি না। এটি ছিল সর্বোতভাবেই একটি গণঅভ্যুত্থান।
বিশাল সাফল্য অর্জনকারী এই গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্র ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণে আন্দোলনকারীরা মনোনীত করেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। কেন ড. ইউনূসকে এই মনোনয়ন—এ প্রশ্নের জবাব মেলেনি। তিনি কি এই গণঅভ্যুত্থানে বা সরকার উৎখাত আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন? এমন কথা তো জানা যায় না। আন্দোলনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততাও পাওয়া যায় না। আন্দোলন এবং হাসিনার পলায়নের সময় তিনি ছিলেন প্যারিসে, অলিম্পিকের উৎসবে। তাকে সরকারের দায়িত্ব নিতে দেশে ফিরতে বলা হয়েছিল। তিনি এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন বলে মনে হয় না। তিনি দেশে ফিরেছেন তিন দিন পরে। ড. ইউনূস আন্দোলনে ছিলেন না, তিনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তার নেই, তা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা তাকেই এই পদে কেন বসালো? হতে পারে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও খ্যাতির কারণে এবং নানা নিগ্রহের মুখেও হাসিনার বিরুদ্ধে তার অবিচল থাকার কারণে আন্দোলনকারীরা ড. ইউনূসকে পছন্দ করেছে। আবার এমনও হতে পারে প্রভাবশালী কোনো তৃতীয় দেশ এ ব্যাপারে প্রভাব খাটিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছেন। দেড় বছর ধরে দেশটা সামাল দিয়েছেন।

আগেই বলা হয়েছে ইতোপূর্বেকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর যে সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের তা ছিল না। তাদের কার্যকালের কোনো মেয়াদও নির্ধারিত ছিল না। নির্ধারিত ছিল না তাদের দায়িত্বও। তারা কী করবে আর কী করবে না—তা সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের এখতিয়ার ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি মেনে নিয়ে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নির্বাচন অনুষ্ঠানের। পাশাপাশি তারা গুরুত্ব দিয়েছিলেন সংস্কার কর্মসূচির ওপর।
সংস্কারের বিষয়টি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে পদ্ধতিতে দেশ চলছে, সরকার চলছে, সংসদ চলছে, প্রশাসন চলছে, সে সব ক্ষেত্রেই সংস্কার প্রয়োজন। এই পদ্ধতি যে দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনে অপারগ—তা তো আজ প্রমাণিত সত্য। এই পদ্ধতি যে স্বৈরাচারী শাসনের পথে দেশকে নিয়ে যায়, সে দৃষ্টান্তও এবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ করে একের পর এক রাজনৈতিক দল দেশের ক্ষমতায় এসেছে। প্রতিবারই ক্ষমতাসীনদের ভাগ্য ফিরেছে কিন্তু জনগণ যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। প্রতিটি সরকারই এসে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, লুটপাটে আগের সরকারকে ছাড়িয়ে গেছে। তাই এ সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না যে, প্রচলিত পদ্ধতিতে জনগণের কল্যাণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দেশের রাজনীতিতে যে দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের সবারই চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য এক। তাই কারও ওপরই আস্থা রাখার সুযোগ নেই। এই কারণেই প্রয়োজন প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতিসহ সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার।
কিন্তু সংস্কার তো খুব সহজ কথা নয়। সেই ইংরেজ আমল থেকে যুগ যুগ ধরে সমাজের প্রতিটি স্তরে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি প্রোথিত হয়ে রয়েছে তাকে মুছে দেয়া সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, সমাজকে পরিবর্তিত চিন্তা-চেতনায় প্রণোদিত করা। এবং এটি রাতারাতি সম্ভব নয়, এটি একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সংস্কারের জন্য সময়ের প্রয়োজন। সে সময় ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার পায়নি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকটি কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনগুলো পরিশ্রম করেছে, নানা মহলের সঙ্গে বৈঠক করেছে, মতামত নিয়েছে। তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের সুপারিশ পেশ করেছে। সুপারিশ পেশ করেছে, কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন হবে কীভাবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের সাফল্যের ঝুলি প্রায় শূন্য বলা যায়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ‘মব ভায়োলেন্স’ এক ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল। চাঁদাবাজি বেড়েছিল। নানা মহল তাদের সুবিধা আদায়ে রাস্তায় নেমে গিয়েছিল দাবি-দাওয়ার ব্যানার নিয়ে। গণঅভ্যুত্থানের পরে মনে হয় সবাই ধরে নিয়েছিল রাস্তায় নামলে কিছু না কিছু আদায় করা যাবে। বিরাজিত এই সব পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউনূস সরকার হিমশিম খেয়েছিল। প্রসঙ্গত বলতে হয়, ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল প্রশাসন। হাসিনার আমলে আওয়ামী ক্যাডার দিয়ে সাজানো প্রশাসন এবং পুলিশ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে খুব একটা সহযোগিতা যে করেনি, তা তো দেখাই গেছে। প্রথমত তারা ছিল আওয়ামী লীগের রিক্রুট করা, দ্বিতীয়ত তারা মনে হয় ধরেই নিয়েছিল এ সরকার ক্ষণস্থায়ী, দুদিন পরে বিদায় নেবে। তাই এদের কথা মতো চলার দরকার নেই। তারা অপেক্ষায় থেকেছে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার।

সময় গুনেছে রাজনৈতিক দলগুলোও। তারা নির্বাচন চেয়েছিল। অনির্বাচিত অসাংবিধানিক সরকারকে তাদেও পক্ষে আর কতদিন মেনে চলা সম্ভব? তাদের কাছে সংস্কার কোন গুরুত্ব পায়নি। তাদের চাপে ড. ইউনূস নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচিত দল ক্ষমতায় এসেছে। তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে। এই পথ ছাড়া এই সরকারের সামনে আর কোন বিকল্প খোলা ছিল না।

কিন্তু তারপর? নির্বাচন তো অনুষ্ঠিত হলো, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অপর প্রতিশ্রুতি সংস্কারের কী হবে? সংস্কার ছাড়া সেই পুরাতন পদ্ধতিতে আবার সেই দলগুলোই সেই একই চরিত্র নিয়ে ক্ষমতায় এলে জনগণের কি লাভ হবে? হাসিনার পতনে কি অন্য সব দল কিংবা রাজনীতিকদের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন এসেছে? আওয়ামী লীগের এই ভাগ্য বিপর্যয় থেকে কি দেশের রাজনীতিকরা কোনো শিক্ষা নিয়েছেন? যদি না নিয়ে থাকেন, যদি সেই পুরনো ব্যবস্থাতেই দেশ ফিরে যায় তবে প্রশ্ন রয়ে যাবে, এত বড় গণঅভ্যুত্থান থেকে দেশের মানুষ কী সুফল পেল? হাজারো মানুষের আত্মাহুতিতে মহিয়ান জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য কি ব্যর্থ হবে? দেশ যেখানে ছিল সেখানেই কি রয়ে যাবে?

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন