রাজনীতিতে আত্মসমালোচনা বিরল। বাংলাদেশে তো আরও বিরল। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত নিজেদের ভুল স্বীকার না করে প্রতিপক্ষের দিকে আঙুল তুলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সেই বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য ‘জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতার দল নয়, আমাদেরও ভুলত্রুটি হয়’ নিশ্চয়ই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ তার সেই সতর্কবাণী ‘সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে তা ভাসে।’
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বক্তব্য কি শুধুই সাময়িক সংকট সামাল দেওয়ার রাজনৈতিক ভাষা, নাকি এটি দলীয় সংস্কৃতিতে একটি নতুন বার্তার সূচনা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকাতে হয়।
জামায়াতের সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। বিষয়টি ব্যক্তিগত জীবনের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এলাকায় প্রতিবাদ, সামাজিক বিতর্ক, রাজনৈতিক সমালোচনা সব মিলিয়ে ঘটনাটি একটি বড় জনআলোচনায় রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত দল তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর আরেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেক নতুন ব্যাখ্যা দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তরুণীর ইচ্ছা এবং পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে হয়েছে। তার আরও মন্তব্য এটি ‘অনৈতিক নয়, অসামাজিক’। এখানেই শুরু হয় বড় বিতর্ক।
কারণ, রাজনীতিতে শুধু সিদ্ধান্ত নয়, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। যদি ঘটনাটি অনৈতিক না হয়, তবে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক শাস্তি কেন? আবার যদি দল মনে করে ঘটনাটি তাদের নৈতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী, তাহলে ‘অসামাজিক’ ও ‘অনৈতিক’-এর সূক্ষ্ম পার্থক্য ব্যাখ্যা করে জনমত কতটা সন্তুষ্ট করা সম্ভব? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
আইনের দৃষ্টিতে কোনো কাজ বৈধ হতে পারে, কিন্তু সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। আবার কোনো আচরণ সামাজিকভাবে সমালোচিত হলেও আইনগত অপরাধ নাও হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দলের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। কারণ রাজনৈতিক দল কেবল আইনের কাঠামো দিয়ে চলে না; তারা চলে নিজেদের ঘোষিত মূল্যবোধ, নীতি এবং আদর্শের ভিত্তিতে।
বিশেষ করে যে দল দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নৈতিক ও আদর্শিক রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছে, তাদের জন্য ব্যক্তিগত আচরণও জনআস্থার অংশ হয়ে যায়।
এ কারণেই শফিকুর রহমানের ‘সাদা কাপড়’ উপমাটি গুরুত্বপূর্ণ। সাদা কাপড়ের সৌন্দর্য তার পরিচ্ছন্নতায়। কিন্তু সেই পরিচ্ছন্নতার দাবিই তাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে। কালো কাপড়ে ছোট দাগ চোখে না পড়লেও সাদা কাপড়ে ক্ষুদ্রতম দাগও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। যে দল নৈতিকতার মানদণ্ড অন্যদের তুলনায় উঁচুতে স্থাপন করে, জনগণও তাদের কাছ থেকে একই অনুপাতে কঠোর জবাবদিহি প্রত্যাশা করে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ডা. শফিকুর রহমান প্রকাশ্যে বলেছেন ‘আমাদের ভুল ধরিয়ে দেন, আমরা সংশোধন করব।’ এই বক্তব্যকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আত্মসমালোচনা প্রায় বিলুপ্ত একটি চর্চা। কিন্তু আত্মসমালোচনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রতিষ্ঠিত হয় বাস্তব পদক্ষেপে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দলের প্রতিটি স্তরে কি একই নীতি প্রয়োগ হবে? একই ধরনের অভিযোগে কি সব নেতার বিরুদ্ধে সমান ব্যবস্থা নেয়া হবে? নাকি ব্যক্তি, পদমর্যাদা ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুযায়ী সিদ্ধান্তের মানদণ্ড বদলে যাবে? জনগণ এখন এই উত্তরই খুঁজছে।
বর্তমান সময়ে আরেকটি বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনীতির চরিত্র বদলে দিয়েছে। আগে কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা সীমিত পরিসরে থাকত। এখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়। তথ্য, গুজব, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, রাজনৈতিক প্রচারণা সব একসঙ্গে মিশে যায়। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সংকট ব্যবস্থাপনাও আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
তবে সংকটের মধ্যেই নেতৃত্বের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়। একটি দল কত বড়, তা ক্ষমতার আকার দিয়ে নয়; সংকট মোকাবিলার পদ্ধতি দিয়ে বিচার করা হয়। জামায়াতের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই অর্থে একটি পরীক্ষার সূচনা মাত্র। পরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি। কারণ বহিষ্কারই শেষ কথা নয়।
জনগণ দেখতে চায়, তদন্ত কতটা স্বচ্ছ ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত ছিল। একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতেও কি একই মানদণ্ড বজায় থাকবে। রাজনীতিতে নৈতিকতার দাবি কেবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার ভাষা নয়; এটি নিজের ওপরও সমানভাবে প্রয়োগ করার সাহস।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো দলই সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। ক্ষমতাসীন হোক কিংবা বিরোধী—সব দলই কোনো না কোনো সময়ে ব্যক্তি-নির্ভর বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সাংগঠনিক বিচ্যুতির মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য তৈরি হয় তখনই, যখন কোনো দল অভিযোগকে চাপা না দিয়ে স্বচ্ছভাবে মোকাবিলা করে।
আজ দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট নেতৃত্বের নয়; বিশ্বাসের। এই বিশ্বাস পুনর্গঠন করতে হলে বক্তৃতার চেয়ে বেশি প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি।
কারণ জনগণ এখন আর শুধু বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খোঁজে।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য তাই একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির মূল্য নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের আচরণ। রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সম্পদ ভোট নয়, আস্থা। আর আস্থা একদিনে তৈরি হয় না; দীর্ঘদিনের সততা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গত আচরণের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে। আবার একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি দ্বৈত মানদণ্ড কিংবা একটি অস্বচ্ছ ব্যাখ্যাই সেই আস্থাকে মুহূর্তে ক্ষয় করে দিতে পারে।
সাদা কাপড়ে দাগ লুকানো যায় না। রাজনীতিতেও যায় না। বরং ক্ষমতা যত বড় হয়, দাগ তত স্পষ্ট দেখা যায়। তাই নৈতিকতার রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; নিজের ঘোষিত আদর্শের প্রতি প্রতিদিন সৎ থাকা।
রাজনীতিতে মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু ইতিহাস কখনও ভুলকে নয়, ভুলের পর আচরণকে মনে রাখে। আত্মসমালোচনা সাহসের পরিচয়; আর আত্মশুদ্ধি নেতৃত্বের। সেই কারণেই আজ প্রশ্ন একটাই জামায়াত কি কেবল একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল, নাকি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করল? নৈতিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা বক্তৃতার মঞ্চে নয়; ক্ষমতা, প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একই নীতি সবার জন্য প্রয়োগ করার মধ্যেই।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
