ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো এক বাবার নীরব ভালোবাসার গল্প

ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো এক বাবার নীরব ভালোবাসার গল্প

ফন্ট সাইজ:

সদ্য পর্দা নামা বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত তারকা মার্ক কুকুরেয়া। বিশ্ব ফুটবলের ঝাঁকড়া চুলের মেলা কিংবা গতিশীল ডিফেন্স- যেকোনো দৃশ্যপটের মাঝেই এই স্প্যানিশ লেফট-ব্যাক এক আলাদা আলোড়ন। তিনি যখন সবুজ গালিচায় ছোটেন, তার পেছনে উড়তে থাকে এই বিশ্বকাপে আইকনিক বনে যাওয়া কোঁকড়ানো লম্বা চুল। প্রথম দেখায় অনেকেই ভাবতে পারেন, হয়তো স্রেফ ফ্যাশন কিংবা নিজস্বতার জন্যই এই রূপ। তবে রুপালি আলোর ঝলকানি আর হাজারো দর্শকের আকাশ কাঁপানো গর্জনের গভীরে লুকিয়ে আছে এক বাবার নিঃশব্দ, গভীর ব্যাকুলতা।
কুকুরেয়া কখনো তার চুল বাঁধেন না। কিংবা বলা যায়, তিনি চুল বাঁধতে পারেন না।

কারণ গ্যালারির অগণিত মুখ আর বিভ্রান্তিকর দৃশ্যের ভিড়ে এই ভাসমান চুলগুলোই যে তার বড় ছেলে মাতেওর জন্য বাবাকে চিনে নেয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। অটিজমে আক্রান্ত শিশু মাতেওর জন্য কোলাহলপূর্ণ এই দুনিয়ায় কোনো কিছুতে চোখ স্থির রাখা ভীষণ কঠিন। স্পেনের সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের রাতে বা চেলসির বড় কোনো ম্যাচের দিনে, যখন সবাই কুকুরেয়ার রক্ষণভাগের তেজ উপভোগ করছিল, তখন মাঠের কোণে বসে থাকা মাতেও স্রেফ খুঁজে ফিরছিল তার চেনা আশ্রয়কে। কুকুরেয়া নিজের স্টাইল নয়, নিজের চুল খোলা রাখেন কেবল এই ভেবে- হয়তো কোনো এক মুহূর্তে মাতেও যদি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, এই চুল দেখে সে যেন অন্তত বুঝতে পারে, ‘ওই তো আমার বাবা!’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাক্ষাৎকারে নিজের আবেগ চেপে রাখতে পারেননি এই স্প্যানিশ তারকা। অশ্রুসজল চোখে কুকুরেয়া বলেন, ‘আমার ছেলেটা অটিজমে আক্রান্ত।

বিশ্বাস করুন, আমার যদি সব টাকা চলেও যেতো আর বিনিময়ে আমার ছেলেটা সুস্থ হতো, আমি তাতেই খুশি হতাম... ও এই চুলগুলো পছন্দ করে, তাই বড় করেছি। যাতে করে এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে ভুলে গেলে ও আবার চিনতে পারে।’ মাতেওর এই অটিজম নির্ণয়ের পর থেকে কুকুরেয়া ও তার স্ত্রী ক্লদিয়া রদ্রিগেজের জীবন আমূল বদলে গেছে। কোটি টাকার চুক্তি কিংবা ফুটবলের ট্রফি- সবকিছুর চেয়ে তখন বড় হয়ে দাঁড়ায় এক চরম বাস্তবতা। শুরুতে যখন মাতেও সাধারণ স্কুলে যেতো, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কান্নাভেজা চোখে তাকে ফিরিয়ে আনতে হতো। ক্লদিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমরা সকালে ওকে স্কুলে রেখে আসতাম আর ফেরার পথে দু’জন গাড়িতে বসে কাঁদতাম। ওকে ওভাবে কষ্ট পেতে দেখাটা আমাদের জন্য অসম্ভব যন্ত্রণার ছিল।’ পেশাদার জীবনের সিদ্ধান্তগুলোও এখন আর কেবল চুক্তির অঙ্কে মাপা হয় না। কোনো নতুন ক্লাব থেকে প্রস্তাব এলে কুকুরেয়া দম্পতি সবার আগে খোঁজ নেন- সেই শহরে মাতেওর জন্য বিশেষ থেরাপি ও উপযুক্ত স্কুল আছে কি না। ‘রেডিও এস্তাদিও নোচ’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কুকুরেয়া সরাসরিই বলেন, আমার পরিবার যদি শান্তিতে থাকে, তবেই আমি মাঠে আমার সেরাটা দিতে পারবো।’
কুকুরেয়ার মতে, মাতেও তাদের জীবনকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে।

ফ্যানদের ভোটে বিশ্বকাপের সেরা একাদশে জায়গা করে নেয়া এই লেফট-ব্যাক বলেন, ‘আমি মনে করি মাতেওর মতো শিশুরা সত্যিই চমৎকার। সে আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে, আমাদের ঘরে অগাধ আনন্দ এনে দিয়েছে এবং পৃথিবীকে এক ভিন্ন চোখে দেখতে শিখিয়েছে।’ আন্তর্জাতিক ফুটবলের জাঁকজমকপূর্ণ ক্যানভাসে এই গল্পটি স্রেফ এক খেলোয়াড়ের নয়, এটি একজন বাবার অভিযোজনের গল্প। সমাজ যে নিয়ম শেখায়, একজন বাবার ভালোবাসা তার চেয়েও অনেক বড় হয়ে ফুটে ওঠে মাঠের প্রতিটি পদক্ষেপে। প্রতিদিনের ছোট ছোট এই রুটিন আর খোলা চুলের চেনা রূপই মাতেওকে দেয় নিরাপত্তার অনুভূতি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন