স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহর যেন এক সন্ধ্যায় পরিণত হয়েছিল ক্রীড়া, সংস্কৃতি আর বর্ণিল আয়োজনের মিলনমেলায়। আলো ঝলমলে পরিবেশ, স্কটিশ ঐতিহ্যের মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনা, সুর-সংগীত আর ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণে জমকালো উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে পর্দা ওঠে কমনওয়েলথ গেমসের। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছে ইনডোরে, ওভিও হাইড্রো অ্যারেনায়। বৃহস্পতিবার রাতে শুরু হওয়া ১১ দিনের এই বৈশ্বিক ক্রীড়াযজ্ঞে তিন হাজারের বেশি ক্রীড়াবিদ ২১৫টি সোনার পদকের জন্য লড়াই করবেন। কিন্তু এবারের আসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইটি কোনো মাঠ, ট্র্যাক বা সুইমিংপুলে হবে না! লড়াইটি কমনওয়েলথ গেমসের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার। একসময় অলিম্পিকের পর বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাল্টি স্পোর্টস ইভেন্ট হিসেবে দেখা হতো এই আসরকে। এখন এই প্রতিযোগিতার আয়োজক খুঁজে পাওয়া কঠিন, ব্যয় সামলাতে গিয়ে বাদ দিতে হচ্ছে জনপ্রিয় সব খেলা, দর্শকের আগ্রহেও পড়েছে ভাটা।
শেষ মুহূর্তে গ্লাসগো এগিয়ে না এলে ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমস হয়তো আয়োজনই করা যেতো না। তাই প্রশ্নটি আর কে সবচেয়ে বেশি পদক জিতবে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, শতবর্ষ ছোঁয়ার আগে কমনওয়েলথ গেমস কি মৃত্যুশয্যায় পৌঁছে যাবে? ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমস হওয়ার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে। মেলবোর্নকেন্দ্রিক আয়োজনের বদলে কয়েকটি আঞ্চলিক শহরে প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। শুরুতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৬০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার। পরিকল্পনা এগোনোর সঙ্গে ব্যয়ের হিসাবও বাড়তে থাকে। ভিক্টোরিয়া সরকার একপর্যায়ে জানায়, আয়োজন করতে প্রায় ৬৯০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নেই জানিয়ে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে স্বাগতিকের দায়িত্ব ছেড়ে দেয় তারা।
শেষ মুহূর্তে আসরটি টিকিয়ে রাখতে ২০১৪ সালের পর আবার কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের দায়িত্ব নেয় গ্লাসগো। ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ না করে আগের ভেন্যু ব্যবহার করা হচ্ছে এবারের আসরে। মাত্র ১০টি ডিসিপ্লিন ও ৬টি প্যারা ক্রীড়া ডিসিপ্লিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রায় ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড বাজেটের এই আয়োজনকে ভবিষ্যতের টেকসই ও ব্যয়-সাশ্রয়ী আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের একটি নতুন মডেল হিসেবেও দাঁড় করাতে চাইছেন আয়োজকরা। গ্লাসগোর ওভিও হাইড্রো অ্যারেনায় আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা নিজ নিজ জাতীয় পতাকা নিয়ে প্যারেড অব নেশনসে অংশ নেন। লাল-সবুজের বাংলাদেশের পতাকা ছিল সাঁতারু সামিউর রহমান রাফির হাতে। আনুষ্ঠানিক পর্বে কমনওয়েলথের পতাকা উত্তোলনের পর গেমসের শপথ পাঠ করেন বোলস কিংবদন্তি পল ফস্টার, হুইলচেয়ার বাস্কেটবল তারকা রবিন লাভ ও অ্যাথলেটিক্স কর্মকর্তা লেসলি রয়। এরপর বক্তব্য দেন কমনওয়েলথ স্পোর্টের সভাপতি ড. ডোনাল্ড রুকারে।
তিনি বলেন, এই গেমস শুধু পদক জয়ের লড়াই নয়, এটি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার একটি মঞ্চ, যেখানে কোনো এক শিশুর স্বপ্নের সূচনা হতে পারে। গ্লাসগো-২০২৬ এর চেয়ারম্যান জর্জ ব্ল্যাক বলেন, অনিশ্চয়তার সময়েও গ্লাসগো পিছিয়ে যায়নি। বরং সবাই মিলে অসম্ভবকে সম্ভব করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। কম বাজেটের উদ্বোধনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কিং চার্লস তৃতীয় ও কুইন ক্যামিলার উপস্থিতি। জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ডক্টর হু-এর টার্ডিসকে কেন্দ্র করে তাদের প্রবেশ অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। পরে কিং চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে গেমসের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে স্কটল্যান্ডের জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। শত শত স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে নৃত্য, সংগীত, নাট্যাভিনয় ও আলোকচিত্রের সমন্বয়ে ফুটে ওঠে স্কটল্যান্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং কমনওয়েলথ পরিবারের ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা। এবারের ১০ ডিসিপ্লিনের মধ্যে চারটিতে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
শুটিং না থাকাতে একেবারেই আশা নেই লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের। কারণ এর আগে কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে বাংলাদেশ আটটি পদক জিতেছে। দু’টি সোনা, চারটি রুপা ও দু’টি ব্রোঞ্জের সব ক’টিই এসেছে শুটিং থেকে। অথচ টানা দ্বিতীয়বারের মতো এই খেলাটি কমনওয়েলথ গেমসে। গ্লাসগোতে বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছেন মাত্র ১৫জন ক্রীড়াবিদ। অ্যাথলেটিকসে পাঁচজন, সাঁতারে চারজন, বক্সিং ও জিমনেস্টিকসে তিনজন করে অংশ নেবেন। ২০১৪ সালে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের জন্য প্রায় ১২ লাখ টিকিট রাখা হয়েছিল। এবার রাখা হয়েছে মাত্র পাঁচ লাখ। তারপরও উদ্বোধনের আগের দিন পর্যন্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ অনেক প্রতিযোগিতার টিকিট অবিক্রীত ছিল। উদ্বোধনের দিনও নির্ধারিত টিকিট বুথেও পর্যাপ্ত অবিক্রীত টিকিট দেখা গেছে।
চাহিদা বাড়াতে স্কটল্যান্ডের ফুটবল সমর্থকদের নির্বাচিত কিছু প্রতিযোগিতার বিনা মূল্যের টিকিটও দেয়া হয়েছিল। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের তুলনায় স্থানীয় উৎসাহও এবার অনেকটাই ম্লান। তবে এর মাঝেও বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে ভারত। ২০৩০ সালের শতবর্ষী আসরের আয়োজক ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। ভারতের আহমেদাবাদে হবে সেই প্রতিযোগিতা। সেখানে ১৫ থেকে ১৭টি খেলা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রিকেট, হকি, ব্যাডমিন্টন, শুটিং, রাগবি সেভেনস ও কুস্তিসহ গ্লাসগো থেকে বাদ পড়া অনেক খেলাই বিবেচনায় আছে। কমনওয়েলথ স্পোর্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অন্তত আরও চার বছরের জন্য আসরটির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছে।
