চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হওয়া সাত বছর বয়সী শিশু ওয়াসিফা জান্নাত তাসকিনকে অপহরণের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। অপহরণের মূল পরিকল্পনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটির পরিবারের সঙ্গে থেকেই তাকে খোঁজার নাটক করেছেন। এমনকি শিশুটিকে খুঁজে পাওয়ার জন্য তার মায়ের সঙ্গে একটি মাজারে গিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়াও করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত সোমবার সকালে স্থানীয় ইমাম আযম আবু হানিফা (র.) স্কুল থেকে ছুটি শেষে সহপাঠীদের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল ওয়াসিফা। এ সময় বাড়ির সামনে অপেক্ষমাণ একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে তাকে বলা হয়, তোমার বাবা অসুস্থ, হাসপাতালে নিয়ে যেতে এসেছি।
পরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় সে কোনো সন্দেহ না করেই সিএনজিতে উঠে যায়। এরপর থেকেই শিশুটি নিখোঁজ হয়। দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানায় পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে উদ্ধার অভিযান শুরু করে পুলিশ। রাঙ্গুনিয়া-রাউজান সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বেলায়েত হোসেন জানান, প্রথমদিকে পুলিশের কাছে শুধু এতটুকুই তথ্য ছিল যে, স্কুল ছুটির পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু সিএনজিটির নম্বর জানা যায়নি, কেউ সেটিকে শনাক্তও করতে পারেনি। এমনকি তদন্তে সহায়ক কোনো স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজও প্রথমে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি দল এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অভিযানে অংশ নেন।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে একটি সিসিটিভি ফুটেজে সিএনজির আংশিক অংশ এবং চালকের অস্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিএনজিটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এএসপি বেলায়েত হোসেন জানান, জিজ্ঞাসাবাদে সিএনজিচালক রাকিব স্বীকার করেন, সিএনজিটির মালিক ফয়সাল, যিনি শিশুটির বাবার মামাতো ভাই। পারিবারিক পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তিনি ওয়াসিফাকে তার বাবা অসুস্থ এবং হাসপাতালে দেখতে যেতে হবে বলে সিএনজিতে তোলেন। পরিচিত হওয়ায় শিশুটি কোনো সন্দেহ করেনি। পরে ফয়সালকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ফয়সাল, সিএনজিচালক রাকিবসহ মোট চারজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও দু-একজন জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ জানায়, অপহরণের পর শিশুটিকে ফয়সালের ভাড়া বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যৌথ অভিযানে তাকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক উল্লেখ করে এএসপি বেলায়েত হোসেন বলেন, ফয়সাল শিশুটির বাবা-মায়ের সঙ্গে থেকেই তাকে খোঁজাখুঁজি করেছে, থানায় গেছে, বিভিন্ন জায়গায় ফোন করেছে। এমনকি শিশুটির মায়ের সঙ্গে একটি মাজারে গিয়ে শিশুটিকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়াও করেছে। অপহরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফয়সাল শিশুটির বাবার মামাতো ভাই। পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় পারিবারিক কোনো বিরোধের জের থাকতে পারে। আবার মুক্তিপণের উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
বিষয়টি তদন্তাধীন এবং সবদিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো- মো. রাকিব (২২), মো. ফয়সাল (৩২) ও মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫৫)। তাদের কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়েছে। দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি হিলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, গ্রেপ্তার তিন আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে বুধবার আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
