দিল্লির রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ

দাবি আদায়ে অনড় ‘ককরোচ’ পার্টি

দিল্লির রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ

ফন্ট সাইজ:

তেলাপোকা পার্টির আন্দোলন মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা করেছে। দাবি না মেটা পর্যন্ত তেলাপোকা জনতা পার্টি মাঠ ছাড়তে রাজি নয়। তারা জানিয়েছে, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষার ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই আরও বেশি শক্তি দিয়ে চলবে। তারা এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোও মোদি সরকারের বিরুদ্ধে চাপ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনের সূচনা করেছে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধরনা কর্মসুচি আন্দোলনে কংগ্রেস নেতৃত্ব দিলেও সমাজবাদী পার্টি, উদ্ভব শিবসেনার মতো দলও এই আন্দোলনে শামিল হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিরোধীরা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অমানবিক আচরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বিরোধীদের বক্তব্য, প্রশ্নফাঁস নিয়ে বাইরে প্রধানমন্ত্রী মোদি কথা বলতে পারেন, কিন্তু সংসদে এসে কিছু বলছেন না কেন। কেন তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। ছাত্র-যুবদের মিছিলে ‘পুলিশি হামলা’ নিয়ে আলোচনা চেয়ে নোটিশ দিয়েছেন রাজ্যসভায় তৃণমূলের মুখ্যসচেতক নাদিমুল হক। এদিন সংসদে সরকার নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত বলে জানালেও, বিরোধীরা দাবি জানিয়েছে যে, আগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করুন।

রাজ্যসভার উত্তপ্ত অধিবেশন চলাকালে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গে বলেন, ‘নিট নিয়ে সুষ্ঠু আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কোনো বিতর্ক হবে না।’
সংসদ চলো কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশের ‘নিষ্ঠুর শক্তি প্রয়োগ’ ‘জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে’, এই অভিযোগে দায়ের করা আবেদনের শুনানিতে দিল্লি হাইকোর্ট দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রকে নোটিশ জারি করেছে এবং সিসিটিভি ও অন্যান্য ফুটেজসহ প্রাসঙ্গিক নথি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে।

শিক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতি, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদে নেতৃত্বদানকারী ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ বা সিজেপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সমস্যা সমাধানের জন্য যেকোনো আলোচনায় সরকারকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তারা আরও জানিয়েছে, সিজেপি’র প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, ‘বুধবার সকালে পুলিশ আবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। তারা আমাদের তার বাসভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা স্পষ্টভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা কারও বাড়ি বা অফিসে যাচ্ছি না। এখানে একটি ‘জনতা দরবার’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং মন্ত্রীরা যদি কথা বলতে চান, তবে তাদের জনগণের কাছে আসা উচিত। আলোচনা যন্তর মন্তরেই হওয়া উচিত।’ যন্তর মন্তরে তেলাপোকা পার্টির আন্দোলনে প্রতিদিন হাজারো ছাত্র-যুব যোগ দিচ্ছেন। ভিড় বাড়ছে যন্তর মন্তরে।

শিক্ষার্থীদের সহযোগী লাদাখের পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশন ভঙ্গ করার জন্য সরকারকে শর্ত দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে পিতার সঙ্গে দেখা করে মোদি সরকারের দুই মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জীতেন্দ্র সিং তাকে অনশন প্রত্যাহার করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে বুধবার তিনি জানিয়েছেন, সংসদ চলো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য পুলিশ যে সমস্ত শিক্ষার্থীকে আটকে রেখেছে তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। তেলাপোকা জনতা পার্টির তরফে বুধবার অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তাকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। দলের তরফে সমাজমাধ্যমে লেখা হয়েছে, ‘সোনম স্যারের কাছে সিজেপি’র অনুরোধ, আপনার আত্মত্যাগ একটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনাকে আপনার অনশনে ইতি টানতে এবং আপনার স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষার ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই আরও বেশি শক্তি দিয়ে চলবে। আমরা এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’ এ সবের মধ্যেই আন্দোলনের আঁচ গিয়ে পড়েছে নিউ ইয়র্ক, লন্ডনের মতো বিদেশের কিছু শহরে। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, অনশনরত ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি জানিয়ে আমেরিকার একটি ‘এডভোকেসি গ্রুপের’ সদস্যরা নিউ ইয়র্ক এবং সান হোসে শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’ নামে ওই গ্রুপ জমায়েত করে নিউ ইয়র্কের ইউনিয়ন স্কোয়্যার এবং সান হোসে শহরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির সামনে। সেই জমায়েত থেকেও উঠেছে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবি। লন্ডন এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ওই গ্রুপেরই সদস্যরা।

শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগও দাবি করেছেন। দিল্লিতে রাহুল গান্ধী ও দলের অন্যান্য নেতাদের আটক করার নিন্দা জানিয়ে কংগ্রেস দেশব্যাপী প্রতিবাদ শুরু করেছে। একইসঙ্গে, সোমবার যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ চলাকালে তাদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপেরও নিন্দা জানিয়েছে দলটি।

তবে নিটের প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে হাতিয়ার করে বিরোধীরা পড়ুয়াদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। বুধবার সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘দিল্লিতে এই ধারাবাহিক বিক্ষোভ গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। কিছু মানুষ দেশের ছাত্র-যুবদের রাজনৈতিক স্বার্থে অস্ত্র করতে চাইছেন- এটা উদ্বেগজনক।’

নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বলেছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তিনটি প্রধান দাবি রয়েছে। প্রথম দাবি হলো, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন এবং এই ব্যবস্থাকে পরিচালনা করার যোগ্যতা তার নেই। তাই তাকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
দ্বিতীয় দাবির বিষয়ে রাহুল বলেন, যারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন- প্রত্যেককে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয় দাবি হিসেবে তিনি বলেন, যিনি এই পুরো ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী গত এক দশকে দেশটিতে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, গত ১০ বছরে দেশে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসেই একটি করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।

সরকারের সমালোচনা করে রাহুল বলেন, এসব ঘটনার কারণে প্রায় সাড়ে সাত কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে রাহুল গান্ধী বলেন, গত ১০ বছরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একজনেরও দণ্ড হয়নি। তার অভিযোগ, সরকার এ ধরনের অনিয়ম রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন