মেসি: যে গল্পের কোনো শেষ নেই

মেসি: যে গল্পের কোনো শেষ নেই

ফন্ট সাইজ:

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাঁশি বাজার আগে গ্যালারির প্রতিটি চোখ একবার হলেও খুঁজে নেবে একটা মুখ। সেটি আর কেউ নন। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ঊনচল্লিশ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে দাঁড়ানো এই মানুষটার জন্য রাতটা যেন এক দীর্ঘ জীবনের বৃত্ত পূর্ণ হওয়ার মুহূর্ত।


২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে উনিশ বছরের এক কিশোর হয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন মেসি। ২০১০ বিশ্বকাপে সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল হেরে চোখের জলে ভাসিয়েছিলেন গোটা আর্জেন্টিনাকে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও গল্পের পূর্ণতা দিতে পারেননি। ২০২২ কাতারে সেই আক্ষেপ ঘুচিয়েছেন। হাতে তুলেছিলেন সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফি। যা ছিল তার ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণ আক্ষেপ। ২০২৬ সালে ক্যারিয়ারে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পাশে বসে গেছেন। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলা হাতে গোনা কজনের একজন মেসি। তবে রোনালদো নিজের শেষ বিশ্বকাপের কথা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। মেসি মুখ ফুটে বলেননি এখনো। কিন্তু এই বয়স, এই শরীর নিয়ে চার বছর পর আবার একই মঞ্চে ফেরা কতটা সম্ভবÑউত্তরটা সবাই জানেন, শুধু স্বীকার করতে চান না কেউ।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সামান্য পেশির চোট নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল আর্জেন্টিনা শিবির। কোচ লিওনেল স্কালোনি খোলাখুলি কিছু না বললেও, পুরো আসরে বিশ্রাম দিয়ে দিয়ে মেসিকে খেলাতে হয়েছে তাকে। তারপরও মাঠে যা দেখিয়েছেন তিনি, তা রূপকথার কাছাকাছি। এই বিশ্বকাপে করেছেন নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও রয়েছেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর ম্যাচে জোড়া অ্যাসিস্ট করে দলকে টেনে নিয়ে গেছেন ফাইনালে। শরীর হয়তো আর আগের মতো নেই, কিন্তু চোখ আর পায়ের জাদু এখনো অটুট। এই বৈপরীত্যই যেন মেসির শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক।


আটবার ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ব্যালন ডি’অর জিতেছেন মেসি। যা আজও কেউ ছুঁতে পারেননি। বার্সেলোনার হয়ে ক্লাব ফুটবলে জিতেছেন প্রায় সবকিছু। তবু দীর্ঘদিন সমালোচকরা বলতেন, বিশ্বকাপ ছাড়া তার কীর্তি অসম্পূর্ণ। ২০২২ সালে কাতারে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সেই অপবাদ ঘুচিয়েছিলেন তিনি। আজ যদি আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় শিরোপা জেতে, তাহলে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের টানা দুই শিরোপার পর ৬৪ বছরে এই কীর্তি গড়া প্রথম দল হবে আর্জেন্টিনা। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হবেন মেসি নিজেই। ২০১৪ সালে মারাকানায় ফাইনাল হেরে ট্রফির মঞ্চে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা মেসির সেই ছবি আজও ভাসে আর্জেন্টাইনদের চোখে। বছরের পর বছর সেই ব্যর্থতার বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে। ২০১৬ কোপা আমেরিকা ফাইনালে হেরে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। সেই মানুষটাই আজ ঊনচল্লিশ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে আছেন ফাইনালের মঞ্চে। হয়তো শেষবারের মতো। প্রতিটি ম্যাচ এখন তার কাছে যেন বাড়তি এক উপহার। বাড়তি সময়। যা পাবেন কিনা তা নিয়ে নিজেও কখনো নিশ্চিত ছিলেন না।


মেসির এই দীর্ঘ পথচলায় বড় অনুপ্রেরণা স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো। ছোটবেলার বন্ধু থেকে জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠা আন্তোনেলা মেসির ছায়া হয়ে ছিলেন সবসময়। ক্লাব ফুটবল হোক বা বিশ্বকাপ-গ্যালারিতে থেকেছেন তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও চিরোকে নিয়ে। ২০২২ সালে কাতারে ট্রফি হাতে মেসির উদযাপনের সেই আইকনিক দৃশ্যে পরিবারের উপস্থিতি ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে আছে। আজ রাতেও, ফলাফল যাই হোক না কেন, গ্যালারির সেই চেনা মুখগুলোই হয়তো সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করবে সময়ের এই বাঁকবদল।
আর্জেন্টিনার রাস্তায়, বুয়েন্সে আয়েন্সের ক্যাফেতে, রোজারিওর অলিগলিতেÑমেসির জন্মশহর জুড়ে আজ রাতের অপেক্ষা যেন নিঃশ্বাস আটকে রাখা এক উৎকণ্ঠা। আটলান্টার গ্যালারিতে থাকা এক আর্জেন্টাইন সমর্থক সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি চান না মেসি অবসর নিন, কারণ তার খেলা দেখে মনে হয় তিনি এখনো পঁচিশ বছরের তরুণ। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ঢাকার অলিগলি থেকে গ্রামের পাড়া পর্যন্ত নীল-সাদা জার্সির উন্মাদনা প্রমাণ করে মেসি কোনো একটা দেশের সম্পত্তি নন, তিনি গোটা বিশ্ব ফুটবলের।
দিয়েগো মারাডোনার উত্তরসূরি হওয়ার যে বোঝা নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন মেসি, সেই তুলনার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। পেলে-মারাডোনা-মেসি-এই ত্রয়ীর মধ্যে তার নাম উচ্চারিত হয় নির্দ্বিধায়। আর্জেন্টিনা ফাইনাল জিতুক বা হারুক, মেসির কীর্তি ফুটবলের পাতায় খোদাই হয়ে থাকবে চিরকাল। তবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে বসিয়ে দেবে এমন এক মুকুটÑযা তাকে চিরতরে পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাবে। মেটলাইফের কয়েক ঘণ্টা স্রেফ একটা ফাইনাল নয়। এটা একটা বিদায়ের প্রস্তুতি, একটা কীর্তির চূড়ান্ত পরীক্ষা, আর কোটি ভক্তের হৃদয়ে খোদাই হয়ে থাকা এক নামের অধ্যায়। যার হয়তো কোনো শেষ নেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন