রাজশাহীর সড়কগুলো যেন ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, স্বজন হারানোর আর্তনাদ এবং ক্ষুব্ধ জনতার বিক্ষোভÑ সবমিলিয়ে সড়ক নিরাপত্তা এখন রাজশাহীর অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে ডাম্প ট্রাক ও বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে জনমনে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। তবে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ট্রাক নয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইন অমান্য, অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দুর্বল তদারকির কারণেই প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ।
গত ৫ই মে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া বিড়ালদহ এলাকায় একটি ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় এক দোকানি নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর এলাকা জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতা দু’টি ডাম্প ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। অভিযোগ রয়েছে ওই সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই ডাম্প ট্রাকগুলো অতিরিক্ত গতিতে এবং নিয়ম না মেনে চলাচল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি একই মহাসড়কের ঝলমলিয়া বাজারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বালুবাহী ট্রাক বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন এবং আহত হন আরও কয়েকজন। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২৬শে জানুয়ারি বেলপুকুর এলাকায় একটি বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনজন। বছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিক এসব দুর্ঘটনা রাজশাহীর সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজশাহী জেলা ও মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগরে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মোট ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১৬৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এ ছাড়া প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক বা ডাম্প ট্রাকের কারণে। ফলে দুর্ঘটনার জন্য কেবল একটি নির্দিষ্ট যানবাহনকে দায়ী না করে সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার দাবি উঠছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। অনেক চালকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স নেই। অনেক যানবাহনের ফিটনেসের মেয়াাদও শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আলামিন সরকার টিটু বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ দায়ী। মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভটভটির জন্য সরকার আলাদা লেন বা সড়ক নির্মাণ না করায় এসব যানবাহন অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে। এসব চালকের অনেকেরই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নেই। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলেন, যেখানে প্রশস্ত সড়ক প্রয়োজন, সেখানে এখনো পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। যেসব স্থানে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, সেগুলোর অধিকাংশই এক লেনের সড়ক। রাজশাহী মেট্রোপলিটনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব। পাশাপাশি অনেক চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই যানবাহন চালাচ্ছেন। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে কাজ করা হবে। পাশাপাশি বর্তমানে যেসব সড়ক এক লেনের, সেগুলো পর্যায়ক্রমে চার লেন ও ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, রাজশাহীতে বর্তমানে ৮৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৪৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে। সড়কের পরিমাণের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা সেই হারে উন্নত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
