দেশবাসী দেড় যুগ পরে একটি কারচুপিমুক্ত সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করছে। ১২ তারিখের নির্বাচনের পরে যে নতুন সূর্য উদিত হবে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য সকলকে ঔদার্য নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নির্বাচনের ফলটা সকলের জন্য আশানুরূপ হবে না। কাঙ্খিত হিসাব সকলের মিলবে না। ব্যক্তি এবং দল হিসেবে কেউ বিজয়ী হবেন, কেউবা হবেন এইবারের জন্য বিফল। কিন্তু জনগণের রায়কে খোলা মনে দ্ব্যর্থহীনভাবে মেনে নেয়ার মানসিকতা সকলের থাকতে হবে। অনেকেই জানেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে নির্বাচনী ফলের ধারাটা যখন সুস্পষ্ট হয়, ফলটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে অনুমান করে নেয়া যায় তখন সম্ভাব্য বিজয়ী দল যেমন বিজয় দাবি করে তেমনি পরাজিত দলও পরাজয়টাকে স্বীকার করে নেয়। বিজয়ী দলের নেতা বিজয় বার্তায় দেশবাসীকে ধন্যবাদ দেয়ার পাশাপাশি বিজিত দল বা জোটের নেতাকেও তাদের নির্বাচনী কর্মসূচীর ভাল দিকগুলোর প্রশংসা করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের সহযোগিতা কামনা করেন। পরাজিত দলের নেতা বা নেত্রী প্রদত্ত ভোটের জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিজয়ী দলের নেতাকে অভিনন্দন জানান। এটিই হয় বিজয়ী এবং পরাজিত নেতাদের মধ্যে প্রথম বাক্য ও শুভেচ্ছা বিনিময়। উভয় পক্ষই একে অপরের প্রশংসা করে নতুন উদ্যমে রাজনীতি শুরু করেন।
বিজয়ী দলকে একদিনের জন্যও শান্তিতে দেশ পরিচালনা করতে দেবনা বলে ওখানে কোন দল দেশটাকে সর্বনাশা পথে ঠেলে দেয় না যেমনটি শেখ হাসিনা নির্বাচনে হারার পর প্রকাশ্যেই প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন। তিনি তার প্রতিজ্ঞা অবশ্য অক্ষরে অক্ষরে রক্ষাও করেছিলেন। দেশবাসী আশা করবে, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যে দল বা জোটই পরাজিত হোক, তারা পরাজয়ের জ্বালা মেটাতে দেশ ধ্বংসের এমন প্রতিজ্ঞা করবে না। বরং আগামী বার যাতে জনগণের মন জয় করে আরও ভালো ফল করতে পারে সেরকম কর্মসূচী গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশে অনেকগুলি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা যে হবে বিএনপি এবং জামাতে ইসলামীর মধ্যে সে ব্যাপারে খুব একটা সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি বড় রকমের আওয়ামী ভোট জাতীয় পার্টির বাক্সে না পড়ে। সচেতন মানুষ অপেক্ষা করবে, নির্বাচনের পরে তারেক রহমান এবং ডা. শফিকুর রহমানের প্রতিক্রিয়া দেখতে।
যেই জিতুক, এবারের নির্বাচনেও এক অর্থে ১৯৯১ সালের নির্বাচনী ফলেরই পুনরাবৃত্তি দেখা যেতে পারে। অঘটনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
আসলেই কে জিতবে, এই প্রশ্নটাই এখন সকলের মুখে মুখে। বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় দল হলেও জামায়াতও নির্বাচনী প্রচারণায় পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এরা শুধু একটি নিবেদিত ক্যাডারভিত্তিক দলই নয়। এদের প্রচারণায় সিদ্ধহস্ত একটা চৌকস ডিজিটাল কর্মী বাহিনী আছে যারা শুরুতে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে দেয়। বিএনপির আগে থেকেই এরা সক্রিয় হয়ে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে যায়। তারা মাঠ পর্যায়ে বিএনপির বিপুল সংখ্যাধিক্যকে ডিজিটাল প্রচারণায় মোকাবেলার কৌশল গ্রহণ করে। এখন যেহেতু গ্রামেও ঘরে ঘরে মোবাইল ফোন আছে তাই তারা সামাজিক, বিশেষ করে ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করে তৃণমূল পর্যায়ে সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হচ্ছে ঘরে ঘরে মহিলাদের মধ্যে জামাত নারী কর্মীদের প্রচারণা। জামায়াত মূলত একটি ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। ফলে মুসলমানদের একটা অংশকে তারা আকৃষ্ট করবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, এর পরিমাণটা কত? জামায়াত ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারত বিভক্তির বিরোধিতা করলেও এখন নিজেকে সবচেয়ে ভারত বিরোধী বলে প্রমাণ করতে মরিয়া। এ কারণে দেশের আধিপত্যবাদ বিরোধী ভোটারদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশকে তারা টানতে পারবে। অপরদিকে জামায়াতের বেশকিছু কর্মকাণ্ড, নেতাকর্মীদের সজ্ঞান বা বেফাঁস মন্তব্য তাদের বিপক্ষে যাবে। অন্তত কিছু মানুষ এগুলোকে পছন্দ করছেন না। তারা নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। অনেকের কাছেই প্রতীয়মান হয়, তারা রাজনীতিতে নারীদেরকে পুরুষদের সমান বলে গণ্য করেন না। নারী কর্মজীবীদের সম্পর্কে যে অপমানজনক মন্তব্য জামায়াত আমীর করেছেন তার খেসারত তাদেরকে বড় আকারেই দিতে হতে পারে। ইসলামভিত্তিক দল হওয়ার কারণে তারা যেমন কিছু অতিরিক্ত মুসলিম ভোট নিজেদের অনুকূলে আনতে পারবেন তেমনি উল্টো দিকে অমুসলিম ভোট হারাবেন। সংখ্যালঘু এলাকায় দুই একজন অন্য ধর্মের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে সাধারণ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আকর্ষণ করা যাবে না। যারা ধর্ম ও রাজনীতিকে এক করে দেখেন না, তাদের ভোট জামায়াত আশা করতে পারে না। একজন জামায়াতপন্থী ও টক শো ফাটানো ব্যারিস্টার যখন জামাতের পক্ষে ভোট প্রদানকে জান্নাতের টিকিট কাটার সমান বলে প্রচারণা চালান তখন মন্তব্য করার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না।
বিএনপির সবচেয়ে বড় পরিচয় এবং শক্তি হচ্ছে এটি দেশের প্রধান এবং প্রথম বাংলাদেশপন্থী দল। কাজেই আজকে যারা এই দলটিকে ভারতের সাথে আঁতাত করে ফেলেছে বলে অভিযোগ করছেন তাদের বক্তব্য সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তিটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে প্রতিরোধের ভিতটিই গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপি। হ্যাঁ, বিএনপি এখন জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রকাশ্যে ঘন ঘন ভারত বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে না। যে দলটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের আশা করছে তারা কি ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই প্রতিবেশী দেশটিকে শত্রু বানিয়ে ফেলতে পারে? ধর্ম, পররাষ্ট্র নীতি, অর্থনীতিসহ সকল বিষয়ে বিএনপি একটি মধ্যপন্থী দল যা তার বিপক্ষের চেয়ে পক্ষেই বেশি কাজ করবে। নারীর অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন বিএনপির একটি বড় শক্তি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথমদিকে বিএনপি একটু পিছিয়ে থাকলেও এখন তারা অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে। আর মাঠের প্রচার প্রচারণায় তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে শুরু থেকেই অনেক এগিয়ে। তাদের জনসমাবশগুলোতে জনসমাগম হয় অনেক বেশী। শহীদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার মত ক্যারিশমেটিক পূর্বসূরি আর কারো নেই। সবশেষে তারেক রহমানের উত্তরণটাও লক্ষণীয়। পরিবর্তিত তারেক রহমান জনগণের কাছে একজন পরিপক্ষ নেতা হিসেবেই প্রতিভাত হচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় সত্ত্বার এক প্রধান উৎস। বিএনপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একে ”চেতনার ব্যবসা” না বানালেও অন্তরে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে যা নির্বাচনে প্রভাব রাখবে বলে অনেকে মনে করেন। শহীদ জিয়াউর রহমান শুধু স্বাধীনতার ঘোষকই ছিলেন না, তার প্রতিষ্ঠিত দলে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাটা বিরাট। জামায়াত যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে কাজেই এই ইস্যুটাকে তারা এখন অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দিতে চায়।
একটা বিষয় আশাব্যঞ্জক। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে জনগণ নিরপেক্ষ সরকার হিসবেই মেনে নিয়েছেন বলে মনে হয়। বিএনপি জোটের কেউ কেউ তাকে জামায়াত ঘেঁষা এবং জামায়াত জোটের কেউ কেউ তাকে বিএনপি ঘেঁষা বলে চিত্রিত করার কোশেশ করছেন। এতে মনে হয় এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সঠিক ট্র্যাকেই, অর্থাৎ পক্ষপাতহীন অবস্থানেই আছেন। অতএব আশা করা যায়, নির্বাচনটা নিরপেক্ষ হবে।
নির্বাচনী ফল প্রত্যাশিতই হোক বা এতে অঘটনই ঘটুক দেশবাসী আশা করে আছেন বিজয়ী এবং বিজিত প্রার্থী, দল এবং জোট ফলটাকে মেনে নেবেন। কারচুপির অভিযোগ এনে দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলে দেবেন না। তারেক রহমান বাবা-মায়ের ভব্যতা, শালীনতা এবং মার্জিত রুচির পথেই হাঁটবেন। ডা. শফিকুর রহমান একজন ভদ্র, বিনয়ী এবং নিরহংকার রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত। আমরা আশা করব ফল পক্ষে বা বিপক্ষে যাক, নির্বাচনের পরে তারা একে অপরকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাবেন। করমর্দন ও বুক মেলানোর জন্য দ্রুত একত্রিত হবেন। সরকারী বা বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে সৌহার্দের সাথে দেশের সেবা করে যাবেন।
আনিসুর রহমান সুইডেন প্রবাসী একজন সিনিয়র বাংলাদেশী সাংবাদিক।
নির্বাচনের পরে করমর্দন ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক দেখতে চাই
আনিসুর রহমান
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার), ২০২৬, ৮ঃ২৪ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
