বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম কোনো নতুন উপাদান নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই কখনো প্রকাশ্যে, কখনো পরোক্ষে ধর্ম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ধর্মের ব্যবহার, অপব্যবহার এবং একে অপরকে ‘কাফের’, ‘হারামপন্থী’ বা ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান এবং উদ্বেগজনক। প্রশ্ন উঠছে—এই নির্বাচন কি আদৌ নীতি, কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে হবে, নাকি ধর্মই হয়ে উঠবে প্রধান মেরুকরণ?
সম্প্রতি কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজের যৌথ জরিপে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। জরিপ অনুযায়ী, ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার সময় ধর্মকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। এই পরিসংখ্যান একদিকে বাস্তবতার প্রতিফলন, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। কারণ এই ভোটার অংশ কোনো প্রান্তিক সংখ্যা নয়; নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলার জন্য এটি যথেষ্ট বড় একটি ব্লক।
কিন্তু মূল প্রশ্নটি হলো—এই ধর্ম কি বিশ্বাসের ধর্ম, নাকি ভোটের ধর্ম?
‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করি না’—দাবি ও বাস্তবতার ফারাক: জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে একটি বক্তব্য দিয়ে আসছে—তারা রাজনীতিতে আছে, কিন্তু ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে না; তারা রাজনীতি করে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনসভায় এই বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করছেন।
কিন্তু বাস্তবতা কি এই বক্তব্যকে সমর্থন করে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দল, যার রাজনৈতিক পরিচয়, ভাষা ও সাংগঠনিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতেই ইসলাম একটি প্রধান প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়াহভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, ইসলামী মূল্যবোধ—এই শব্দ ও ধারণাগুলো জামায়াতের রাজনৈতিক অভিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করি না’—এই দাবি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু সমাজবিজ্ঞান বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এটি সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ।
এবারের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো—ধর্মভিত্তিক শক্তিগুলোর মধ্যেই প্রকাশ্য বিভাজন ও তীব্র দ্বন্দ্ব।
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া মুসলমানদের জন্য ‘জায়েজ নয়’, বরং ‘হারাম’। চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের উপস্থিতিতে দেওয়া এই বক্তব্য নিছক ধর্মীয় ফতোয়া নয়; এটি সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান।
তিনি নির্বাচনকে ‘জিহাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং জামায়াতকে ‘রগ কাটার গোষ্ঠী’ বলেও উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। প্রথমত, হেফাজত আর নিজেকে কেবল অরাজনৈতিক কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। দ্বিতীয়ত, তারা কার্যত বিএনপির সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে। তৃতীয়ত, জামায়াতকে প্রতিপক্ষ বানাতে ধর্মীয় ভাষা ও আবেগকে সরাসরি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
চরমোনাই পীরের অভিযোগ: ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম, যিনি চরমোনাই পীর নামে পরিচিত, জামায়াতের বিরুদ্ধে আরও একধাপ এগিয়ে দ্বিমুখী রাজনীতির অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, জামায়াত প্রকাশ্যে এক কথা বলে, কিন্তু গোপনে অন্য কাজ করে—ভারত ও আমেরিকার সঙ্গে বৈঠক করে।
তিনি বলেছেন, “ডাল মে কুচ কালা হ্যায়”—অর্থাৎ কোথাও গলদ আছে। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত স্পষ্ট: জামায়াত আদর্শিক রাজনীতির কথা বললেও বাস্তবে তারা কৌশলগত ও সুবিধাবাদী রাজনীতিতে লিপ্ত। চরমোনাই পীর আরও অভিযোগ করেছেন, ইসলামী দলগুলোর ভোট এক বাক্সে নেওয়ার মৌখিক সমঝোতা জামায়াতের কারণেই ভেস্তে গেছে। এই বক্তব্য প্রমাণ করে, ইসলামী রাজনীতির ভেতরেই নেতৃত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
ধর্ম বনাম রাজনীতি—না কি রাজনীতির জন্য ধর্ম? এই প্রেক্ষাপটে আবারও প্রশ্ন উঠে আসে—বাংলাদেশের নির্বাচনে ধর্ম কি স্বাভাবিক একটি ফ্যাক্টর, নাকি সচেতনভাবে এটিকে ফ্যাক্টর বানানো হচ্ছে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ একটি ধর্মপ্রাণ সমাজ। ভোটারদের একটি বড় অংশ ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন সেই ধর্ম বিশ্বাসের জায়গা ছেড়ে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়। তখন ধর্ম আর নৈতিক পথনির্দেশক থাকে না; বরং ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
চিত্রটা স্পষ্ট—এক দল বলছে, ইসলাম বাঁচাতে জামায়াতকে রুখতে হবে। আরেক দল বলছে, ইসলামের নামেই রাজনীতি করা তাদের অধিকার। তৃতীয় দল বলছে, জামায়াত মুখে ইসলাম, কাজে ষড়যন্ত্র।
এই পারস্পরিক অভিযোগ, তাকফির ও দোষারোপের রাজনীতিতে সাধারণ ভোটার বিভ্রান্ত হচ্ছে। ধর্ম এখানে আর নৈতিক মানদণ্ড নয়; বরং রাজনৈতিক মেরুকরণের কৌশল।
বিএনপি প্রকাশ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কথা না বললেও বাস্তবে ধর্মীয় শক্তিগুলোর সমর্থনকে তারা কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে—এমন বিশ্লেষণ অমূলক নয়। হেফাজতের শীর্ষ নেতার বক্তব্য বিএনপি প্রার্থীর উপস্থিতিতে আসা নিছক কাকতাল বলে ধরে নেওয়া কঠিন। বিএনপি জানে, জামায়াতকে সরাসরি জোটে নিলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক বাড়বে। তাই তারা ধর্মীয় ভোটকে ভেঙে, জামায়াতকে কোণঠাসা রাখার কৌশল নিচ্ছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে জোরালো।
বিএনপির ইশতেহারেও ধর্মীয় ভাষা অনুপস্থিত নয়। সেখানে বলা হয়েছে—আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে এবং ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। অর্থাৎ ধর্মীয় অনুভূতিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার পথেও তারা হাঁটছে না।
যদিও নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্মকে ব্যবহারের বিষয়ে আছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কোনো প্রার্থী যদি সেই নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির বিধানও রয়েছে।
আর ভোটারদের অজ্ঞতাকেই রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আগামী নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, সেই সিদ্ধান্তেরও মুহূর্ত। ভোটার যদি ধর্মকে বিবেচনায় নেন, তাহলে প্রশ্ন হলো—তিনি কোন ধর্ম দেখবেন? মসজিদের মিম্বরের ভাষণ, নাকি রাজনৈতিক দলের বাস্তব আচরণ? যে ধর্ম মানুষকে ন্যায়, সততা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়—সেই ধর্ম কি আজ রাজনীতিতে দৃশ্যমান? নাকি ধর্মের নামে চলছে কেবল পারস্পরিক অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার ‘জিহাদ’?
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। ধর্ম যদি ভোটের ফ্যাক্টর হয়, তবে তা যেন হয় মূল্যবোধের আলোকে—ক্ষমতার অন্ধকার খেলায় নয়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
ভোটের মাঠে ধর্ম: বিশ্বাস নাকি ক্ষমতার অস্ত্র
নিয়াজ মাহমুদ
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার), ২০২৬, ৮ঃ২১ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
