২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি বিতর্ক, সমালোচনা এবং নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কারণেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। নকআউট পর্বে পৌঁছানোর পর রেফারিং, ভিএআর সিদ্ধান্ত, ড্রয়ের নিয়ম, শাস্তি স্থগিত, এমনকি রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও ফিফার বিরুদ্ধে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। যদিও কিছু অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, আবার কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার অভাবই এসব বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রোনালদোর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত
পর্তুগালের তারকা ফরোয়ার্ড ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রতিপক্ষকে কনুই মারার অপরাধে তিন ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সেই শাস্তি স্থগিত করে ফিফা। ফলে তিনি বিশ্বকাপে খেলতে পারেন।
ফিফা জানায়, এক বছরের পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে একই ধরনের অপরাধ না করলে শাস্তি কার্যকর হবে না। শৃঙ্খলাবিধির একটি ধারা ব্যবহার করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সমালোচকদের মতে, সাধারণ শাস্তির নিয়ম থেকে এটি ছিল ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত।
ফিফা পিস প্রাইজ’ ও ট্রাম্প বিতর্ক
বিশ্বকাপের আগে ফিফা নতুন “ফিফা পিস প্রাইজ” চালু করে এবং প্রথম পুরস্কারটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে দেয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই পুরস্কার তৈরির বিষয়ে ফিফা কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্য আগাম কিছুই জানতেন না। একই সময়ে ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় এই পুরস্কার ঘোষণাকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন ওঠে।
ড্রয়ের নিয়ম বদলে সুবিধা পেল শীর্ষ দল?
এবার প্রথমবারের মতো টেনিসের মতো সিডিং পদ্ধতি ব্যবহার করে বিশ্বকাপের নকআউট সূচি সাজায় ফিফা। এতে শীর্ষ র্যাঙ্কিংধারী দলগুলো ফাইনালের আগে একে অপরের মুখোমুখি না হওয়ার সুযোগ পায়।
সমালোচকদের মতে, এতে স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো তুলনামূলক সহজ পথ পেয়েছে, অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলগুলোর সামনে কঠিন প্রতিপক্ষ এসেছে। ফিফা অবশ্য বলেছে, প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই পরিবর্তন করা হয়েছে।
হাইড্রেশন বিরতি নিয়েও বিতর্ক
প্রথমবারের মতো সব ম্যাচে বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের হাইড্রেশন বিরতি চালু করে ফিফা। অনেক কোচ ও ফুটবলার মনে করেন, এতে ম্যাচের স্বাভাবিক গতি ও ছন্দ নষ্ট হয়েছে। আবার সমালোচকদের অভিযোগ, সম্প্রচারকারীদের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের সুযোগ করে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফিফা অবশ্য আর্থিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
‘ভিএআরজেগন্টিনা’ বিতর্ক
আর্জেন্টিনার একাধিক ম্যাচে ভিএআরের সিদ্ধান্তকে ঘিরে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির একটি ট্যাকল শাস্তি এড়িয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে একটি গোল বাতিল এবং সম্ভাব্য পেনাল্টি না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিশরের কোচ ও খেলোয়াড়রা। তারা অভিযোগ করেন, সিদ্ধান্তগুলো আর্জেন্টিনার পক্ষেই গেছে।
অন্যদিকে ফিফার রেফারি প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন এবং ম্যাচ কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিরোধিতা করেন।
সুইজারল্যান্ড ম্যাচেও ভিএআর বিতর্ক
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার জয়ের ম্যাচেও ভিএআর হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন সুইজারল্যান্ডের খেলোয়াড় ও কোচ। যদিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।
বালোগানের নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাম্পের ফোন
যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড দেখলেও পরে তার নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে ফিফা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ এবং আইনি প্রচেষ্টার পর এই সিদ্ধান্ত আসে।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেন, তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিটি নিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বিষয়টি রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ আরও জোরালো করে।
ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচে ‘স্কাইক্যাম’ বিতর্ক
ইংল্যান্ড-নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে অভিযোগ ওঠে, ইংল্যান্ডের সমতাসূচক গোলের আগে বলটি মাঠের ওপর ঝুলন্ত স্কাইক্যামে লেগেছিল। নরওয়ের খেলোয়াড়রা প্রতিবাদ জানালেও ফিফা জানায়, বলের সেন্সর ডেটায় এমন কোনো স্পর্শের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচের সময় বদলের চেষ্টা
শেষ ষোলোর ম্যাচে ইংল্যান্ড ও মেক্সিকোর ম্যাচের সময় ছয় ঘণ্টা এগিয়ে আনার কথা বিবেচনা করেছিল ফিফা। প্রথমে আবহাওয়ার কথা বলা হলেও পরে জানা যায়, মূল উদ্বেগ ছিল নিরাপত্তা। ইংল্যান্ড ও মেক্সিকো- দুই ফুটবল ফেডারেশনই এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করলে শেষ পর্যন্ত সময় পরিবর্তন করা হয়নি।
আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচে ‘সমঝোতার’ অভিযোগ
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ৩-৩ ড্রয়ের ফলে ইরান বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। ম্যাচের শেষদিকে দুই দল আক্রমণের গতি কমিয়ে দেওয়ায় ১৯৮২ সালের কুখ্যাত ‘ডিসগ্রেস অব গিখন’- এর সঙ্গে তুলনা টানা হয়। যদিও দুই দলের কোচই কোনো ধরনের সমঝোতার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
