বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, এটি বদলে যাওয়া বিশ্বেরও এক জীবন্ত আয়না। এখানে যেমন গোল হয়, তেমনি জন্ম নেয় নতুন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এবারের আসরে শুধু ফুটবলাররাই জয়ী হচ্ছেন না; জয়ী হচ্ছে অভিবাসনের ইতিহাস, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ এবং বৈচিত্র্যের শক্তিও।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল এখন নিশ্চিত। ফুটবলের চার পরাশক্তি ফ্রান্স, স্পেন, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড শেষ চারের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে। এক সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ স্পেন, অন্যটিতে আর্জেন্টিনার সামনে ইংল্যান্ড। চারটি দলই বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী শক্তি, কিন্তু তাদের বর্তমান সাফল্যের পেছনে আরেকটি মিল রয়েছে অভিবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা অসংখ্য ফুটবলারের অবদান।
সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারির গল্পটি এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেও তিনি উল্লাস করেননি। বরং পিতৃভূমির সমর্থকদের দিকে হাতজোড় করে সম্মান জানিয়েছেন। সেই দৃশ্যটি মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের পরিচয় কেবল একটি পাসপোর্টে সীমাবদ্ধ নয়। জন্মভূমি, পারিবারিক শিকড়, বেড়ে ওঠা এবং নাগরিকত্ব সব মিলিয়েই গড়ে ওঠে একজন মানুষের পূর্ণ পরিচয়।
এই বিশ্বকাপে এমন গল্পের শেষ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগান, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলে, কানাডার জোনাথন ডেভিড, জার্মানির দেনিজ উনদাভ, মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি,তালিকাটি দীর্ঘ। কেউ নাইজেরীয়, কেউ আলজেরীয়, কেউ ক্যামেরুনীয়, কেউ মালি কিংবা হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁরা নিজ নিজ দেশের সবচেয়ে বড় ভরসা।
ফুটবল ইতিহাসে অভিবাসী খেলোয়াড় নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, এটি আর ব্যতিক্রম নয়; বরং আধুনিক ফুটবলের নতুন বাস্তবতা।
বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের প্রায় ২৩ শতাংশই জন্মগ্রহণ করেছেন এমন একটি দেশে, যার জাতীয় দলের হয়ে তাঁরা খেলছেন না। অর্থাৎ প্রতি চারজনের একজনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিবাসন, দ্বৈত পরিচয় কিংবা প্রবাসী পরিবারের ইতিহাস।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি এসেছে ফ্রান্সকে ঘিরে। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৯৯ জন ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে, কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র ২৩ জন ফ্রান্সের জার্সি গায়ে খেলছেন। বাকিরা আফ্রিকা, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এই একটি পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয়, আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক শুধু কোনো ক্লাব বা লিগ নয়; বরং অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস বহনকারী সমাজগুলো।
বিশেষ করে ফ্রান্স আজ বিশ্বের ফুটবল প্রতিভার এক বিশাল নার্সারিতে পরিণত হয়েছে। প্যারিস ও তার আশপাশে বেড়ে ওঠা অসংখ্য তরুণ আজ বিভিন্ন দেশের জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলছেন। কেউ জন্মসূত্রে ফরাসি, কিন্তু পারিবারিক শিকড় আফ্রিকায়; কেউ আবার পূর্বপুরুষের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মরক্কোর উত্থানও তার উজ্জ্বল উদাহরণ। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, স্পেন ও কানাডায় বেড়ে ওঠা বহু ফুটবলার আজ মরক্কোর জার্সিতে খেলছেন। একই চিত্র দেখা যায় সেনেগাল, আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, কঙ্গো কিংবা হাইতির মতো দেশেও।
অন্যদিকে ইউরোপের রাজনীতিতে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস কিংবা যুক্তরাজ্যে অভিবাসন এখন সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর একটি। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, শরণার্থী গ্রহণ, নাগরিকত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামাজিক সংহতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। অনেক রাজনৈতিক দল অভিবাসন কমানোর প্রতিশ্রুতিকে রাজনৈতিক মূলধনে পরিণত করেছে। কিন্তু ফুটবল যেন সেই রাজনীতিকে প্রতিনিয়ত নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
যাঁদের পরিবার একদিন অভিবাসী হিসেবে ইউরোপে এসেছিল, তাঁদের সন্তানরাই আজ জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেশের সবচেয়ে বড় গর্বে পরিণত হচ্ছেন। গ্যালারিতে তখন কেউ তাঁদের বংশপরিচয় জানতে চান না; সবাই শুধু গোল উদ্যাপন করেন।
ফ্রান্স তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ক্যামেরুনীয় বাবা ও আলজেরিয়ান মায়ের সন্তান কিলিয়ান এমবাপ্পে আজ শুধু ফ্রান্সের অধিনায়ক নন, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। মালি বংশোদ্ভূত উসমান দেম্বেলে, আলজেরীয় শিকড়ের রায়ান শেরকি, ক্যামেরুনীয় বংশোদ্ভূত অরেলিয়েন চুয়ামেনি ফরাসি দলের শক্তির বড় অংশই বহুসাংস্কৃতিক সমাজের প্রতিফলন।
মরক্কোকে হারিয়ে ফ্রান্স সেমিফাইনালে উঠেছে, স্পেন বেলজিয়ামকে বিদায় করেছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড নরওয়েকে এবং আর্জেন্টিনা সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করেছে। ফলে বিশ্বকাপের শেষ চারেই জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী চার ফুটবল শক্তি।
অবশ্য এই বাস্তবতা শুধু ফ্রান্সের নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের পেছনে রয়েছে আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়রা। কানাডার উত্থানের গল্পেও রয়েছে হাইতিয়ান অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের অবদান। ইউরোপের আরও অনেক দেশ এখন তাদের জাতীয় দলে বহুজাতিক পরিচয়ের খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভরশীল।
এটি শুধু ফুটবলের পরিবর্তন নয়; এটি বিশ্বায়নেরও প্রতিচ্ছবি। মানুষের চলাচল, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা পৃথিবীকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আন্তঃসংযুক্ত করেছে। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ফুটবল মাঠে।
তবে এখানেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ফুটবলে অভিবাসীদের সাফল্য মানেই অভিবাসন-সংক্রান্ত সব নীতির সমর্থন নয়। একটি রাষ্ট্রের অভিবাসননীতি নির্ধারিত হয় তার নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, সুযোগ, শিক্ষা ও সঠিক পরিবেশ পেলে অভিবাসী পরিবারের সন্তানেরাও একটি দেশের জন্য অসাধারণ সম্পদে পরিণত হতে পারেন।
বিশ্বকাপ সেই সত্যটিই বারবার মনে করিয়ে দেয়। ফুটবলের ভাষায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা বংশপরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে প্রতিভা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও যোগ্যতা। যে সমাজ বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেই সমাজই জয়ী হয়।
এখন চোখ সেমিফাইনালে। ফ্রান্স-স্পেন এবং আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড এই চার পরাশক্তির মধ্য থেকে দুটি দল উঠবে মহারণের ফাইনালে। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি কার হাতে উঠবে, কোন দেশের ঘরে যাবে বিশ্বসেরার মুকুট? সেই উত্তর জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ফাইনালের শেষ বাঁশি পর্যন্ত।
তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই নিশ্চিত। ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু কে চ্যাম্পিয়ন হলো, সেটি নয়। এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে সীমান্ত মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু প্রতিভাকে নয়; বৈচিত্র্যকে যারা আপন করে নিতে পারে, ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত তাদেরই পাশে দাঁড়ায়।
এই দর্শনের প্রতিফলনই যেন ফুটে ওঠে ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের কথায় `You can be a player, you can be an international star, but above all that, you are a citiæen. We are not disconnected from the world. We are citiæens before we are athletes.’ অর্থাৎ, “তুমি একজন খেলোয়াড় হতে পারো, আন্তর্জাতিক তারকাও হতে পারো। কিন্তু সবার আগে তুমি একজন নাগরিক। আমরা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন নই; আমরা ক্রীড়াবিদ হওয়ার আগে নাগরিক।”
হয়তো এ কারণেই বলা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজয়ী কোনো একক দেশ নয়; বরং বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করার সেই মানবিক দর্শন, যা আবারও প্রমাণ করেছে প্রতিভার কোনো সীমান্ত নেই।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
বিশ্বকাপে অভিবাসীদের গোলেই বদলে যাচ্ছে ফুটবলের মানচিত্র
নিয়াজ মাহমুদ
মত-মতান্তর
২ ঘন্টা আগে
১২ জুলাই (রবিবার), ২০২৬, ৯ঃ২৯ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
