রাবার ও চায়ের রাজধানী-খ্যাত এ জেলার পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দাদের নিয়ে এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কারণ গেল ক’দিন থেকে চলছে বৃষ্টি। ইতিমধ্যেই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদী, হাওর ও গাঙ টইটম্বুর। জেলার মনু ও ধলাই নদীর কয়েকটি স্থানের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে কুলাউড়া, রাজনগর ও কমলগঞ্জের প্রায় অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত। হঠাৎ করে বন্যা কবলিত হওয়ায় নদীতীরের মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। উজানের ঢল ও ভারী বর্ষণ না থামলে জেলাজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা রয়েছে। বন্যা নিয়ে নদী ও হাওর তীরের বাসিন্দারা যেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। তেমনি নদী, হাওর ও পাহাড় বেষ্টিত এজেলার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক লোকজনও রয়েছেন দুর্ঘটনার চরম ঝুঁকিতে। কারণ বৃষ্টি থামছে না। মনু ও ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ও উপচে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। অন্যান্য নদী ও হারের পানি বিপদ সীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। বানের পানি গ্রাস করছে মৎস্য খামার, কৃষিক্ষেত, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি। অবিরাম বর্ষণে অতীতের মতো পাহাড় ধসে যে কোনো সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। তারপরও পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে চরম ঝুঁকি নিয়েও বসবাস করছেন স্থানীয়রা। বলছেন বিকল্প আবাসন না থাকায় তারা ওখানেই থাকছেন। জানা যায়, জেলার ৭টি উপজেলার সবক’টিতেই টিলা কেটে পাহাড়ের চূড়া, পাদদেশ কিংবা পাহাড় ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে স্থায়ী বসতবাড়ি। ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে এ রকম চরম ঝুঁকিপূর্ণ জীবন-যাপন করছেন জেলার প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। প্রতিবছরই বর্ষায় পাহাড় ধসে বাড়ি ঘর হয় বিধ্বস্ত। শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। বাড়ে হতাহতের পরিসংখ্যান। সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় আর অবাধে পাহাড় কাটায় প্রতিবছরই এমন বিপর্যয়। শুষ্ক মৌসুমে অবাধে পাহাড় কেটে তৈরি হয় বসতঘর। বিক্রি হয় মাটি। এরপর নানা কৌশলে প্রভাবশালীরা দখলে নেন সরকারি ওই পাহাড়ি টিলা। ওখানে বসতঘর বানিয়ে লোকবসান। গৃহহীন অসহায়রা আশ্রয় নেয় এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে। দীর্ঘদিন থেকে এভাবেই চলছে পাহাড়ি টিলা কেটে দখল আর বসতি। এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্ধাদের। জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ এই ৫টি উপজেলার পাহাড়ি এলাকার এমন দৃশ্য সচরাচর। একই অবস্থা জেলার রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায়ও। কী পরিমাণ জায়গা ও বসবাসকারী তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারি কোনো দপ্তরে না মিললেও স্থানীয়দের তথ্যানুযায়ী ৭টি উপজেলায় শুধু অধিক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক। তারা জানালেন অবাধে পাহাড় কাটায় যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ। তেমনি উজাড় হচ্ছে পাহাড়ি বনবৃক্ষ ও জঙ্গল। আর চরম হুমকির মুখে পড়ছে পাহাড়ি টিলা বেষ্টিত এ জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ, বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র্য। কিন্তু তা স্থায়ীভাবে প্রতিরোধে কোনো কার্যকর প্রদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্টদের।
বড়লেখা: ওই উপজেলায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৯শে জুলাই রাতে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আব্দুল হাসিবের বসতঘর মাটিচাপা পড়লেও অলৌকিভাবে ছয় মাসের শিশু-সন্তানসহ পরিবারের ছয় সদস্য বেঁচে যান। এর ক’দিন আগে ওই এলাকায় আরেক ব্যক্তি পাহাড় চাপায় প্রাণ হারান। ২০১৪ সালে শাহবাজপুর চা বাগানে পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের ১৮ই জুন ভোররাতে বড়লেখার মধ্যডিমাই গ্রামের আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী ও মেয়ে বসতঘরের টিলা ধসে মারা যান। আর গেল প্রায় ২ যুগে মাটি কাটতে গিয়ে ৮-১০ জন শ্রমিকও প্রাণ হারান। বড়লেখা উপজেলার কাঁঠালতলী, বিওসি কেছরিগুল, ডিমাই, উত্তর ডিমাই, মধ্য ডিমাই, দক্ষিণ ডিমাই, হাতি ডিমাই, উত্তর শাহবাজপুর, সায়পুর, কলাজুরা, হাকাইতি, কাশেম নগর, জামকান্দি, মোহাম্মদ নগর, পূর্ব মোহাম্মদ নগর, সাতরা কান্দি, মুড়াউলসহ অনেক এলাকায় রয়েছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর।
জুড়ী: জায়ফর নগর, পশ্চিমজুড়ী, সাগরনাল ও গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের ৮-১০ হাজার মানুষ।
কুলাউড়া: ব্রাহ্মণবাজার, ভাটেরা, বরমচাল, টিলাগাঁও, জয়চণ্ডী, কর্মধা ও পৃত্থিমপাশা ইউনিয়নে প্রায় ১২-১৪ হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। ২০২২ সালে কুলাউড়ার ভাটেরায় পাহাড় ধসে একই গ্রামের ৩ শিশু মারা যায়।
রাজনগর: টেংরা, মুন্সীবাজার ও উত্তরভাগ ইউনিয়নের একাধিক গ্রামে হাজার খানেক মানুষ।
মৌলভীবাজার সদর: আথানগিরি, চাঁদনীঘাট ও মোস্তফাপুর ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের প্রায় ৪-৫ হাজারের অধিক মানুষ।
কমলগঞ্জ: ইসলামপুর, মাধপুর, রহিমপুর, আদমপুর ও কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়ন একাধিক গ্রামের প্রায় ৬-৭ হাজার মানুষ।
শ্রীমঙ্গল: আশিদ্রোন, কালীঘাট, রাজঘাট, সিন্দুরখান, কালাপুর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষ। ওই দুই উপজেলায় পাহাড় কেটে পাদদেশে কিংবা চূড়ায় তৈরি হচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট। এতে পাহাড় ধসের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল মানবজমিনকে জানান- পাহাড় ধসে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পাহাড়ি জনপদে তারা সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
