বৃষ্টিতে ডুবলো চট্টগ্রাম, পাহাড় ধসের শঙ্কা

বৃষ্টিতে ডুবলো চট্টগ্রাম, পাহাড় ধসের শঙ্কা

ফন্ট সাইজ:

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর সমান পানি জমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী সাধারণ মানুষকে পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। একইসঙ্গে টানা বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় সতর্কতা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সরজমিন দেখা গেছে, সকাল থেকেই চকবাজার, কাতালগঞ্জ, উত্তর আগ্রাবাদ, কমার্স কলেজ রোড, হালিশহর, ইপিজেড, বন্দর, পাঠানটুলি, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা, রেয়াজউদ্দিন বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে যায়। অনেক স্থানে বাসাবাড়ি ও দোকানপাটেও পানি প্রবেশ করেছে। কোথাও কোথাও যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কর্মজীবী মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। রিকশা ছাড়া অন্যান্য যানবাহনের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম।

উত্তর আগ্রাবাদের বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, ভারী বৃষ্টি হলেই নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নগরীর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও অধিকাংশ স্থানে খাল, নালা ও ড্রেন দিয়ে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়নি এবং অনেক এলাকায় বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে পানি নেমে যেতে শুরু করেছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সকালে কাতালগঞ্জ এলাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, গতকাল সকাল থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টি প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে অব্যাহত রয়েছে। পুরো নগর ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। লালখান বাজার এলাকায় কয়েকটি বড় গাছ উপড়ে পড়েছে এবং পতেঙ্গা বিমানবন্দর সড়কের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকাও পরিদর্শন করেন।

মেয়র বলেন, নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত রাখতে পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিনরাত কাজ করছেন। খাল, নালা ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, পানি প্রবাহ সচল রাখা এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ফলেই অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুম জুড়ে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নাগরিক সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। খাল, নালা ও ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক ফেললে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী জানান, নগর জুড়ে পানি নিষ্কাশনের কাজ অব্যাহত রয়েছে। কয়েকটি স্থানে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলেও বৃষ্টি কমে এলে পানি দ্রুত নেমে যাবে। তবে পতেঙ্গা এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কাজ চলাকালে কিছু ব্যক্তি সিটি করপোরেশনের কর্মীদের কাজে বাধা দিয়েছেন এবং ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রপাতি ছিনিয়ে নিয়েছেন। ফলে ওই এলাকায় পানি সরতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল জানান, পতেঙ্গা এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের জন্য তৈরি করা অস্থায়ী বাইপাস সড়কের শোল্ডারের একটি অংশ অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে মেরামতকাজ শুরু করেছে। চট্টগ্রাম আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্রের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, চলতি মৌসুমে এটিই ২৪ ঘণ্টার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। গত কয়েক বছরের মধ্যেও এটি অন্যতম সর্বোচ্চ। নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ১১ই জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা এবং নগরীতে জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জোয়ারের সময় সাগরে পানি নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা আরও বাড়ছে, তবে ভাটার সময় পানি দ্রুত নেমে যাবে।

এদিকে টানা বর্ষণে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। আকবর শাহ ঝিল-১, ২ ও ৩ নম্বর এলাকা, বিজয়নগর, শান্তিনগর, বেলতলীঘোনা, মতিঝর্ণা, টাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিল সংলগ্ন পাহাড়, ঢেবারপাড়, আমবাগান, দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার সেকান্দর কলোনি, ঠান্ডাছড়ি, সন্দ্বীপ কলোনিসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি আটটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত জানান, রোববার রাত থেকেই মাঠপর্যায়ে মাইকিং করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোর কাছে গিয়ে তাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রামে এখনো পাহাড় ধসে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও প্রবল বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও কক্সবাজার শহরে পাহাড় ধসে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হওয়ায় চট্টগ্রামেও পাহাড় ধসের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রেললাইন, বন্ধ ট্রেন চলাচল: টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রামের জানালীহাট স্টেশন এলাকায় রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট থেকে এ রুটে ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়। রেললাইন ডুবে যাওয়ায় পর্যটক এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন মাঝপথে আটকে পড়েছে। এতে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীসহ শত শত মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। রেলওয়ে সূত্র জানায়, টানা বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে জানালীহাট স্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি ষোলশহর স্টেশন অতিক্রম করার পর জানালীহাট স্টেশনের আগে সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় থামিয়ে দেয়া হয়।

দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ট্রেনটি সেখানেই অবস্থান করছিল। পরে বিকাল ৪টা ৫৩ মিনিটে ট্রেনটিকে নিরাপত্তার স্বার্থে ষোলশহর স্টেশনে ব্যাক (ফিরিয়ে) আনা হয় বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে, রেললাইনের উপর গাছ ভেঙে পড়ায় কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেনটিকেও দোহাজারী রেলওয়ে স্টেশনে আটকে রাখা হয়। ফলে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে উভয় দিকের ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। প্রবাল এক্সপ্রেসের যাত্রী কামাল উদ্দিন বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার থেকে ট্রেনটি ছেড়ে আসে। কিন্তু রেললাইনে অতিরিক্ত পানি থাকায় ট্রেনটি সামনে এগোতে পারছে না। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা আটকে আছি।

জানালীহাট স্টেশনের স্টেশনমাস্টার নিজাম উদ্দিন বলেন, রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পানি নেমে গিয়ে রেললাইন নিরাপদ হলেই ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা হবে। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদারও জানান, অতিবৃষ্টিতে রেললাইন ডুবে যাওয়ার কারণে জানালীহাট এলাকায় ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু করা হবে। রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষও দুপুরের দিকে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন