খামেনির স্মরণে নজিরবিহীন শোকযাত্রা

খামেনির স্মরণে নজিরবিহীন শোকযাত্রা

ফন্ট সাইজ:

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যের অংশ হিসেবে দেশটির পবিত্র নগরী কোমে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ-মাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৭ই জুলাই) স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় কোমের ঐতিহাসিক জামকারান মসজিদে জানাজা নামাজের মাধ্যমে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। নামাজে ইমামতি করেন প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাভাদি আমোলি। জানাজার পর খামেনির কফিন নিয়ে শোকযাত্রা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বুলেভার্ড অতিক্রম করে হযরত ফাতিমা মাসুমাহ (সা.)-এর পবিত্র মাজারের দিকে অগ্রসর হয়।

তাসনিমে প্রকাশিত আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে দেখা যায়, কোমের রাজপথ লাখ লাখ শোকাহত মানুষের ভিড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। শোকযাত্রায় ইরানিদের পাশাপাশি তুরস্ক, ইরাক, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলিম প্রতিনিধিদলও অংশ নিয়েছে।

এর আগে সোমবার রাজধানী তেহরানে আলি খামেনির প্রধান শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে লাখো মানুষ জড়ো হয়ে প্রয়াত নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। আলি খামেনির শেষ বিদায় উপলক্ষে গত শুক্রবার থেকে ইরান জুড়ে শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কর্মসূচি। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার খামেনির কফিন প্রতিবেশী ইরাকে নেয়া হবে। সেখানে নাজাফ ও কারবালায় পৃথক শোকযাত্রা ও জানাজার আয়োজন করা হবে। অনুষ্ঠানে ইরানের মিত্র শিয়া রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের অংশ নেয়ার কথা রয়েছে।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হবে বৃহস্পতিবার। সেদিন মাশহাদে আরেকটি শোকযাত্রা শেষে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।

মোজতবার আড়াল নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে
আলি খামেনির জানাজা ও শোকানুষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি ছাড়াও বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পার্লামেন্ট স্পিকারসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও হাজির হয়েছেন। তবে এত বিপুল উপস্থিতির মধ্যেও সবার নজর কেড়েছে একজনের অনুপস্থিতি, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ওই হামলায় নিহত হন তার বাবা আলি খামেনি, স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেল এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য। এবার স্ত্রী ও বাবার জানাজা ও শোকানুষ্ঠানেও তিনি অনুপস্থিত।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হত্যাচেষ্টার আশঙ্কা থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসছেন না। তবে আলি খামেনির অন্য ছেলেরা- মোস্তফা, মেইসাম ও মাসউদ খামেনি শোকানুষ্ঠানে অংশ নেয়ায় এবং ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে মোজতবার অনুপস্থিতি নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

তেহরানে জানাজায় অংশ নেয়া ২৬ বছর বয়সী মাসুমেহ আল জাজিরাকে বলেন, মোজতবার অনুপস্থিতি ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু তার উপস্থিতি দেশের নিরাপত্তার প্রতীক হতে পারতো। এখন মনে হচ্ছে, আগের মতো নিরাপত্তা আর নেই। গত সোমবার তেহরানে শোকযাত্রা চলাকালে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতিও হুমকিসূচক বক্তব্য দিয়েছেন।

হিব্রু ভাষায় দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, আলি খামেনিকে ইসরাইল হত্যা করেছে, কারণ তিনি ইসরাইল ধ্বংসের পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কাটজ বলেন, হত্যাকারী নিজেই নিহত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো ইরানি নেতা আবারো ইসরাইল ধ্বংসের পরিকল্পনা করলে তাকেও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। এর আগের সপ্তাহেও তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, মোজতবা খামেনি ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছেন। এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান।

নিরাপত্তার কারণে আড়ালে?
৩৫ বছর বয়সী ফায়েজেহ, যিনি জানাজায় উপস্থিত ছিলেন, বলেন- মোজতবা খামেনির নিরাপত্তার জন্য আপাতত তার জনসমক্ষে না আসাই ভালো। শত্রুরা যখন আগের নেতার প্রতিও কোনো দয়া দেখায়নি, তখন নতুন নেতার ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে। তার মতে, সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি সরকারের কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো প্রভাব ফেলেনি। তবে তিনি বলেন, এটি অনেকটা শিয়াদের অদৃশ্য ইমামের প্রতি বিশ্বাসের মতো- আপনি তাকে দেখছেন না, কিন্তু তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করছেন।

তবে মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য নিয়েও জোর গুঞ্জন চলছে। রয়টার্সকে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার মুখমণ্ডলে আঘাত লাগে এবং একটি বা উভয় পায়ে গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। তেহরানের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী সোমাইয়েহ বলেন, সরকার যদি দেশের সর্বোচ্চ নেতার নিরাপত্তাই নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে এটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। মনে হচ্ছে সরকার জনগণের কাছে পুরো সত্য তুলে ধরছে না।

তার অভিযোগ, সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সরকারের কিছু অংশ নিজেদের সিদ্ধান্ত তার নামে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।

কতোদিন চলবে এই অনুপস্থিতি?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিদিন জনসমক্ষে উপস্থিত থাকার রীতি নেই। সাধারণত তিনি টেলিভিশনে ভাষণ, লিখিত নির্দেশনা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। তবে জাতীয় সংকট বা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইরানি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মরতাজাভি বলেন, রাজনৈতিকভাবে জনগণের সামনে নেতার উপস্থিতি একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা। প্রতিদিন না হলেও আগের দুই সর্বোচ্চ নেতাকে সংকটের সময় দেখা যেত। তার মতে, নিরাপত্তাজনিত কারণে মোজতবার অনুপস্থিতির যৌক্তিকতা থাকলেও এটি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। তিনি বলেন, তাকে চিরকাল আড়ালে রাখা সম্ভব নয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন