বাজেট বাস্তবায়ন ও দেশের সার্বিক উন্নয়নের পথে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বাধা বলে মন্তব্য করেছেন- জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সমাজে জবাবদিহিতা, সততা ও স্বচ্ছতার অভাবই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ অভিহিত করে গত সাড়ে ১৭ বছরের সব গুম, খুন ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি জানিয়েছেন তিনি। সোমবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতির প্রভাব তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের সমাজে বাজেটের বাস্তবায়ন বা উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে- দুর্নীতি। এখানে জবাবদিহিতার বড় অভাব রয়েছে। সততা ও স্বচ্ছতার যে ঘাটতি, সেটিই আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ হয়তো একদিনে দূর হবে না, কিন্তু আমাদের কোনো একটা জায়গা থেকে পদ্ধতিগতভাবে শুরু করতে হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাজেট বাস্তবায়ন করেন রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন (ইভ্যালুয়েশন) না থাকায় অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর অন্তর বাজেটের মূল্যায়ন রিপোর্ট সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই-জুন অর্থবছরের কারণে বছরের শেষদিকে তাড়াহুড়ো করে অর্থ ছাড় হয়। প্রথম ১০ মাসে ৪২ শতাংশ কাজ হলেও শেষ দুই মাসে বাকি কাজ দেখানোর মহোৎসব চলে। এর ফলে অপচয় এবং লুটপাটের দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে যায়। এ কারণে আমরা প্রস্তাব করেছি অর্থবছরকে ক্যালেন্ডার ইয়ার বা জানুয়ারি-ডিসেম্বর অনুযায়ী নির্ধারণ করার জন্য।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের তিন ধরনের ট্যাক্স দিতে হয়। একটি যায় সরকারি ট্রেজারিতে, দ্বিতীয়টি যায় কিছু অসৎ কর্মকর্তার পকেটে এবং তৃতীয়টি দিতে হয় চাঁদাবাজদের। যদি এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় অপশন বন্ধ করা যায়, তবে ব্যবসায়ীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে আরও বেশি ট্যাক্স দেবেন এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এই টাকা জনগণের। বাজেটে এই টাকা ফিরিয়ে আনার কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই। পাচারকৃত টাকার সামান্য অংশও যদি ফিরিয়ে আনা যায়, তবে দেশে কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না। দুর্নীতিবাজদের শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, শুধু সম্পদ ফিরিয়ে আনলে হবে না, যারা এই লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত সেই কালপ্রিটদেরও ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ডাকাত তৈরি হবে।
এ সময় তিনি বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’- হিসেবে অভিহিত করে আশা প্রকাশ করেন যে, এই সংসদ এমন কোনো আচরণ করবে না যাতে সাধারণ মানুষ ব্যথিত হয়। বরং দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। গত সাড়ে ১৭ বছরের সব গুম, খুন ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সাড়ে ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের বীরদের রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। গুম হওয়া পরিবারগুলোর কষ্ট লাঘব করতে হবে।
বিচারের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চার মাস পার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যে গতিতে বিচার আশা করেছিল তা দেখা যাচ্ছে না। অপরাধী যত বড়ই হোক, তাদের দ্রুততম সময়ে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন ও আদ্-দ্বীন হাসপাতাল চালুর দাবি: ডা. শফিকুর রহমান দেশের স্বাস্থ্য খাতকে একটি মানবিক ও ‘মিশনারি’- মডেলে রূপান্তর করার ওপর জোর দেন। দেশের চিকিৎসকদের প্রতিভার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোর পরিদর্শনে রেগুলারেটরি সংস্থাগুলো যতটা কঠোর ও তৎপর, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ততটাই নিষ্ক্রিয়। সরকারি খাতে বড় কোনো অপরাধ বা গাফিলতি হলেও সবাই বহাল তবিয়তে পার পেয়ে যাচ্ছে- উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ যেখানেই হোক, সরকারকে দুই খাতকেই সমান চোখে দেখতে হবে।
সমপ্রতি বন্ধ হওয়া আদ্-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা থাকলে তার তদন্ত হোক এবং দোষীদের শাস্তি হোক, এতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই হাসপাতালের সঙ্গে প্রায় ৭৫০ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং সমপরিমাণ নার্সিং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত। কেবল বই পড়ে কেউ ডাক্তার বা নার্স হতে পারে না, তাদের জন্য হাসপাতাল ও রোগী অপরিহার্য। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে হাসপাতালটি বন্ধ রাখায় এই শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার এখন অন্ধকারের মুখে। এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যা থেকে দেশ প্রচুর রেমিট্যান্স অর্জন করছে। মাঝপথে হাসপাতাল বন্ধের মতো সিদ্ধান্তহীনতা ও অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরা আর বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখাবে না। তাই মানবিক ও যৌক্তিক কারণে অতি দ্রুত আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি খুলে দেয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি প্রবাসীদের আস্থায় আনার বা সম্মানিত করার কোনো বিশেষ উদ্যোগ লক্ষ্য করেননি জানিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। প্রবাসীদের বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকট নিরসনে তিনি সংসদ থেকে একটি বিশেষ সর্বদলীয় ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, যেখানে সরকারিভাবে মাত্র ৮৫ হাজার টাকায় একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা, সেখানে একটি চক্র সিন্ডিকেট করে একেকজন নিরীহ কর্মীর কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই সিন্ডিকেট দেশের যুবকদের সব সম্বল কেড়ে নিচ্ছে। তিনি এই গণতান্ত্রিক সরকারকে শক্ত হাতে এই চেইন এবং সিন্ডিকেট ভেঙে খানখান করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া দালালের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়ার জেলে বন্দি থাকা শ্রমিকদের মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর সামপ্রতিক সফরের প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মূল অপরাধী দালালদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
রাজনৈতিক প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান জুলাই বিপ্লবের বীরদের রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের প্রশংসা করেন এবং এর পরিধি আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার ভাতাও যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধির অনুরোধ জানান।
নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ (মিরপুর-কাফরুল) আসনের চরম দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এর আগের অধিবেশনে পানি সংকটের কথা বলার পর প্রধানমন্ত্রী নিজে এর দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মিরপুরের মানুষ কারবালার মতো এক ফোঁটা পানির জন্য প্রতিদিন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। আর অন্যদিকে কিছু অসাধু রাজনৈতিক চক্র রাতের বেলা পানির মেইন পাইপ কেটে অবৈধ সংযোগের বাণিজ্য চালাচ্ছে। দায়িত্ব যেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজের কাঁধে নিয়েছেন, তাই এলাকার এই সংকটের ভালো-মন্দ এবং সুনাম-বদনাম এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ওপরই বর্তাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে দেশের সব সংসদ সদস্যকে সমহারে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান তিনি।
আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ধীরগতির সমালোচনা করতে গিয়ে সিলেট ও মৌলভীবাজারের আঞ্চলিক রসবোধের ছোঁয়ায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঢাকা-সিলেট চার লেন মহাসড়কের কাজের যে গতি, তাতে মনে হয় এটি আগ্রার তাজমহলের মতো কিছু একটা হবে। কচ্ছপ বা গুই সাপের গতিতে চলা এই মহাসড়কের ঢেউ খেলানো রাস্তার কারণে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যোগাযোগমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি দ্রুত এই কাজ শেষ করার তাগিদ দেন। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরার দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জেলা ভোলার ভাগ্য পরিবর্তনে ‘ভোলা সেতু’ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান। তিনি রসাত্মক সুরে বলেন, ভোলা তার শ্বশুরবাড়ি নয়, তবে এটি দেশের গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদের এক নিয়ামতের খনি। এই সেতু হলে তা গোটা দেশের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে শক্তিশালী বন্ধুরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও পানিসম্পদ মন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান বিরোধীদলীয় নেতা। রাজনীতিকদের নিজের নামের পেছনে না ছুটে কাজের পেছনে ছোটা উচিত। অতীতের সমস্ত গ্লানি, অনৈক্য ও বৈষম্য মুছে দেশের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার এক নতুন, সমৃদ্ধ ও বীরের বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।
