মেসি যখন নীল হাঙ্গরের মুখোমুখি

মেসি যখন নীল হাঙ্গরের মুখোমুখি

ফন্ট সাইজ:

হাঙ্গরকে ভয় পান না-এমন কেউ কি আছেন এই পৃথিবীতে। কারণ হাঙ্গর এক ভয়ংকর প্রাণী। জীবন্ত মানুষকে গিলে খেয়ে ফেলে। এরমধ্যে যদি নীল হাঙ্গর হয়, তাহলে তো কথাই নেই। জানেন, বিশ্বফুটবল তারকা লিওনেল মেসি
মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন এক নীল হাঙ্গরের। তার গর্জন আমরা শুনতে পাচ্ছি। গর্জনের শব্দে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ রীতিমতো কাঁপছে। এই রূপকথার নায়ক কারা? ওমা, জানেন না বুঝি! তারা আর কেউ নন।

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা ছোট এক দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। আয়তন মাত্র ৪ হাজার ৩৩ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ৫ লাখ ৩০ হাজার। আমাদের গুলিস্তানে এই পরিমাণ মানুষ প্রতিদিন আসা-যাওয়া করেন। এই দেশটি বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর জায়ান্ট কিলার। মেসির আর্জেন্টিনা এই নীল হাঙ্গরের মুখোমুখি হবে ৪ঠা জুলাই। এই লড়াইকে ঘিরেই আলোচনা এখন তুঙ্গে। আলোচনা হচ্ছে-দেশটির সামপ্রতিক ফুটবল ইতিহাস নিয়ে। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবকে কাঁপিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটা রীতিমতো এক ফুটবল বিপ্লব। এর নায়ক হচ্ছেন চল্লিশ বছর বয়স্ক গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। তাকে বলা হয়ে থাকে গ্রেট ওয়াল। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় ট্রল। কেউ কেউ বলেন, বড় হিরো। এই বয়সেও স্পেনের লামিন ইয়ামাল কিংবা নিকো উইলিয়ামসদের একের পর এক শট যেভাবে তিনি আটকে দিয়েছেন তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তিনি নাকি জাদু জানেন। আর এই জাদুতেই ইতিহাসে এক মহাকাব্য রচনা করেছেন।

এই রূপকথার নায়করা TUBAROES AZUIS নামেই পরিচিত। ব্লু শার্ক বা নীল হাঙ্গর। অজানা এই রোমাঞ্চকর রহস্য নিয়ে ফুটবলভক্তরা অনেকটাই নড়েচড়ে বসেছেন। এরইমধ্যে ঘানার তেলভিন সোয়াহ আডজে, নানা কোয়াকু বনসাম ভবিষ্যদ্বাণী করে বসেছেন। শূন্য থেকে ভেসে ওঠা এই দ্বীপরাষ্ট্রে শত শত বছর কোনো মানুষের বসতি ছিল না। পর্তুগীজ নাবিকরা এই দ্বীপের আবিষ্কার করেন। নির্জন এই দ্বীপকে দাস ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করেন। আফ্রিকার মূল ভূখণ্ড থেকে ক্রীতদাসদের এনে এখানে রাখা হতো। এরপর পাচার করা হতো ইউরোপ-আমেরিকায়। শত শত বছর তাদের ওপর এই নির্যাতন-নিপীড়ন চলে। এক পর্যায়ে তারা বিদ্রোহ করে বসে।

’৭৫ সনের ৫ই জুলাই তারা পর্তুগীজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে-কেপ ভার্দের মূল ভূখণ্ডে যত মানুষ বসবাস করেন, তার চেয়ে বেশি বাস করেন বিদেশে। খরা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে লাখ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও ফ্রান্সে বসবাস করেন। এসব প্রবাসীরাই এই মুহূর্তে কেপ ভার্দের ফুটবলের নিয়ামক শক্তি। বোস্টন অথবা রটারড্যামে যদি আপনি হাঁটতে থাকেন, তখন আপনার মনে হবে- কেপ ভার্দেই আছেন। মজার মজার তথ্য আছে এই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে নিয়ে। বিশ্বের অন্যতম বড় বড় লগারহেড সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন এখানে। কেপ ভার্দের আইন খুবই কড়া। কচ্ছপের কেউ কোনো ক্ষতি করলে সরাসরি জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এক ধূলিঝড় নিয়ে মিডিয়ায় প্রতিবছরই শোরগোল হয়। এটা আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি থেকে উড়ে আসে।

বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তার বিখ্যাত এইচএমএস বিগল জাহাজে বিশ্বভ্রমণে বের হয়েছিলেন। তার প্রথম যাত্রাবিরতি ছিল এই কেপ ভার্দেতে। দ্বীপটির ভূ-প্রকৃতি দেখেই তার মাথায় বিবর্তনবাদের চিন্তা আসে। জেনে রাখা ভালো- কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন গঠিত হয় ১৯৮২ সনে। ১৯৮৬ সনে ফিফা স্বীকৃতি দেয়। সে সময় তাদের র‌্যাঙ্কিং ছিল ১৮০-এরও নিচে। তখন আফ্রিকার কাপ অব ন্যাশনস অথবা বিশ্বকাপ খেলার কথা ভাবতোই না তারা। কিন্তু হঠাৎই তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। স্বপ্ন দেখতে থাকে। ২০১৩ সনে প্রথমবারের মতো আফ্রিকা কাপ অব ন্যাশনসে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এখানেই শেষ নয়। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত চলে যায় তারা। তখন থেকেই তাদের নাম আফ্রিকায় আলোচিত হতে থাকে। ২০২৪ সনে ঘানা ও মোজাম্বিককে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়। পেয়ে যায় বিশ্বকাপে খেলার টিকিট? স্মরণীয় মুহূর্ত ২০২৫ সনের ১৩ই অক্টোবর। এসওয়াতিনিকে হারিয়ে ’২৬ বিশ্বকাপের ইতিহাসে লাল হরফে এই ব্লু শার্কদের নাম খোদাই করা হয়।

রোনালদো কী করবেন
মেসি যখন নীল হাঙ্গরের সঙ্গে লড়বেন, তখন ফুটবলের আরেক কিংবদন্তি তখন কী করবেন। তিনি কি শুধু টিভির সামনে বসেই এই লড়াই উপভোগ করবেন? কাউকে সমর্থন দেবেন না! ইতিহাস বলে অন্য কথা। রোনালদো চাইবেন- তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মেসি যেন হেরে যান। এর কারণ দুটো। তার প্রতিদ্বন্দ্বী তার সঙ্গে লড়াইয়ের আগেই যেন বিদায় নেন। অন্য কারণটা হচ্ছে- কেপ ভার্দের প্রতি রোনালদোর একটা রক্তের ঋণ। রোনালদোর প্রপিতামহীর জন্ম কেপ ভার্দেতে।
যাই হোক, অনেকেই এই লড়াইকে ইতিহাস-ভূগোলের গোলকধাঁধা হিসেবে বর্ণনা করছেন।

শুধু গোলরক্ষকই নন, অভিজ্ঞ রায়ান মেন্দেস রয়েছেন এই দলে। ৩৬ বছর বয়সী এই ফরওয়ার্ড তুরস্কের ইগদির এফকে-তে খেলেন। অসম্ভব গতি। মাঠে দলকে চাঙ্গা রাখার পক্ষে সহায়ক। কেপ ভার্দে কীভাবে রাতারাতি এত শক্তিশালী হয়ে উঠলো? এর পেছনে কি আলাদা কোনো রহস্য রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, দু’টি মাস্টার স্ট্রোক আছে। রটারড্যাম কানেকশন ও ডায়াসপোরা স্কোয়াড। কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন বুঝতে পেরেছিল- শুধু দেশের ভেতরের পরিকাঠামো দিয়ে বিশ্বমঞ্চে লড়াই করা সত্যিই কঠিন। তাই তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাদের খুঁজতে শুরু করে।

’২৬ বিশ্বকাপে দলের ২৬ সদস্যের ১৪ জনের জন্মই কেপ ভার্দের বাইরে। এর মধ্যে শুধু নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম বন্দর নগরীরই ছয়জন। তারা ইউরোপের সেরা একাডেমিগুলোতে বড় হয়েছেন। শিখেছেন ট্যাকটিক্যাল ফুটবল। ফুটবল ফেডারেশন তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে কেপ ভার্দের জাতীয় দলে খেলার জন্য রাজি করায়। কোচ বুবিস্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থা দলটির সাফল্যের অন্যতম কারণ। আধুনিক ফুটবলে যেখানে দুই-তিনটা ম্যাচ হারলেই কোচ বরখাস্ত হন, সেখানে বুবিস্তার ওপর কেপ ভার্দে টানা ছয় বছর ভরসা রাখে। স্পেনকে রুখে দেয়াকে বুবিস্তার সাফল্যই বলা হয়।
শেষ কথা- ভোজিনিয়া কি পারবেন জাদুকর মেসিকে রুখে দিতে! মেসি তো এবার এসেছেন কাপ নিয়ে যেতে। পরপর দু’বার কাপ নিয়ে তিনি আরেকটা রেকর্ড করতে চান। সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড তো ইতিমধ্যেই ছিনিয়ে নিয়েছেন।

কেপ ভার্দের সামনে কঠিন এক পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ সর্বকালের অন্যতম ফুটবলার লিওনেস মেসির আর্জেন্টিনা। লড়াইটা যে কঠিন- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেপ ভার্দে হেরে গেলেও কিছু এসে যায় না। তারা তো এমনিতেই কোটি কোটি ফুটবল-ভক্তের মন জয় করে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেছে। যাকে বলা হচ্ছে সর্বকালের সেরা রূপকথা। এই রূপকথা এখন রঙিন। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন