চলে গেলেন রং তুলির জাদুকর

চলে গেলেন রং তুলির জাদুকর

ফন্ট সাইজ:

বহুগুণে গুণান্বিত শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার। পাপেট-টিভি-চিত্রকলাসহ নানা মাধ্যমে ছিল তার সদর্প বিচরণ। একুশে  পদকপ্রাপ্ত এই গুণী শিল্পী আর নেই। গতকাল রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ই জুন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মুস্তফা মনোয়ারকে আজ বিকালে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হবে। সোমবার দুপুরে তার মরদেহ ধানমণ্ডির ১ নম্বর সড়কে নিজ বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। দাফনের আগে বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হবে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।

পারিবারিক সূত্র জানায়, আজ সকাল ৯টায় মুস্তফা মনোয়ারের মরদেহ প্রথমে নেয়া হবে বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণে। সেখানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে রাখা হবে। শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নেয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে, সেখানে জানাজা সম্পন্ন হবে। জানাজা শেষে মরদেহ আধা ঘণ্টার জন্য নেয়া হবে তার প্রিয় কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। চারুকলার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ বিকালে বনানী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে।

গুণী এই শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পৃথক শোক বার্তায় তারা মুস্তফা মনোয়ারের অবদানের কথা স্মরণ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

মুস্তফা মনোয়ারের জন্ম ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ সালে, মাগুরা জেলার শ্রীপুরে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি। তার হাতেখড়ি হয় কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। পরে নারায়ণগঞ্জের একটি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে পড়াশোনা শেষ না করে ভর্তি হন কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে এবং ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।
চারুকলায় পড়াশোনা করলেও মুস্তফা মনোয়ার পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। কিন্তু চিত্রকলা, নির্দেশনা বা শিশুদের নানা অনুষ্ঠানের বাইরে পাপেট ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেট নিয়ে কাজ করেছেন। মুস্তফা মনোয়ারের তৈরি করা পাপেট চরিত্র, পারুল বাংলাদেশে একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’ তার পরিকল্পনাতেই তৈরি হয়েছিল। তার বর্ণাঢ্য পেশাজীবনে তৈরি করেছেন রক্তকরবী ও মুখরা রমণী বশীকরণের মতো অসংখ্য নাটক। দর্শকদের মন কেড়েছে নতুন কুঁড়ি, মনের কথার মতো অনুষ্ঠান। বিশেষ করে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর বিষয়ে তিনি অনুষ্ঠান করেছেন।

মুস্তফা মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে। এরপর একে একে কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশন থেকে ফজল-এ-খোদা রচিত ও আজাদ রহমান সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতের পরিচালনায় ছিলেন মুস্তফা মনোয়ার। ১৯৭২ সালে বিটিভি থেকে প্রচারিত শিশু প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে জনপ্রিয় নতুন কুঁড়ির রূপকার তিনি। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য মুস্তফা মনোয়ার ২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন