ইতিহাসের নায়ক কানাডার সেই ‘ইঞ্জিন

ইতিহাসের নায়ক কানাডার সেই ‘ইঞ্জিন

ফন্ট সাইজ:

যেন ক্লান্তিহীন ট্রেনের ইঞ্জিন। সময় গড়ায়, ভার বাড়ে। তবে ইঞ্জিন থামে না। এগিয়ে চলে। রোববার রাতে এমন দৃশ্যে মঞ্চায়ণ করেন স্টিফেন ইউস্তাকিও। যোগ করা সময়ে ডি বক্সের বাইরে থেকে করা তার চোখ ধাঁধানো এক শটে ইতিহাস গড়ে কানাডা। প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউটে পা রেখেই জয়! রোববার শেষ-৩২ পর্বের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ গোলে হারায় আসরের অন্যতম আয়োজক কানাডা। ব্যক্তি জীবনের দুঃখকে আড়াল করে কানাডার ইতিহাস গড়ার নেপথ্যে ২৯ বছর বয়সী এ ইউস্তাকিও।

ফুটবলে মিডফিল্ডারকে বলা হয় দলের ইঞ্জিন। কিন্তু স্টিফেন সাধারণ ইঞ্জিন নন। তিনি সেই পুরনো বাষ্পচালিত ইঞ্জিন। যার গায়ে মরিচা ধরে না। তেল ফুরালেও তেজ কমে না। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছোটেন একই গতিতে। কখনো রক্ষণে ফিরেছেন আবার আক্রমণে গেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন পাঁচবার।
১৯৯৬ সালে কানাডার অভিবাসী পরিবারে জন্ম নেন স্টিফেন ইউস্তাকিও। জীবনের শুরুর দিকে যিনি লড়াই আর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কাটিয়েছেন। ভাগ্যের সন্ধ্যানে পর্তুগাল থেকে কানাডায় আসে তার বাবা-মা। লেক এরিতে বাবা জেলের কাজ করতেন। মা কাজ করতেন মাছ প্রক্রিয়াকরণ ফ্যাক্টরিতে। অভাবে সংসারে বড় হওয়া স্টিফেন চার বছর বয়সে প্রথম ফুটবল খেলেন। বড় ভাই মাউরো ইউস্তাকিও স্থানীয় ক্লাবে খেলতেন। সেই সুবাদে ফুটবলার হওয়ার বাসনা জাগে মনে। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে নেন প্রাথমিক দীক্ষা। ১১ বছর বয়সে তার পরিবার শেকড়ে ফিরে যায়। পর্তুগালের নাজারেন্সেস যুব দলের হয়ে খেলা শুরু করেন। এরপর পতুর্গালের বিভিন্ন ক্লাবের যুব দলে আলো ছড়িয়ে লীগের দ্বিতীয় স্তরের দল লেক্সোসের নজরে পড়েন। সেখানে স্টিফেনের পেশাদার জীবন শুরু।

২০১৯ সালে তিনি মেক্সিকোর বিখ্যাত ক্লাব ক্রুজ আজুলে যোগ দেন। দুর্ভাগ্যবশত, অভিষেক ম্যাচে গুরুতর চোটে পড়েন। যে কারণে প্রায় আট মাস তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়। চোট কাটিয়ে পর্তুগালের ক্লাব পাসোস দে ফেরেইরাতে ধারে যোগ দিয়ে আলো ছড়ান। ২০২২ সালে ডাক পড়ে পর্তুগালের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব এফসি পোর্তো এ ডিফেন্ডারকে দলে নেয়। ক্লাবটির হয়ে প্রাইমাইরা লিগা, তাসা দে পর্তুগালসহ একাধিক বড় শিরোপা জেতেন। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে পান গোলের দেখা। এরপরই নেমে আসে জীবনের কঠিন অধ্যায়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে পোর্তোর হয়ে সান্তা ক্লারার বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার মা এসমেরালদা। ঠিক এক বছর পর হৃদ্‌রোগে বাবাকেও হারান তিনি। সেই ট্র্যাজেডিকে একপাশে রেখে এবারের বিশ্বকাপে কানাডা ফুটবলের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছেন ধারে মেজর লীগ সকারের ক্লাব লস অ্যাঞ্জেলেস এফসিতে খেলা স্টিফেন। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত ইউস্তাকিও বলেন, ‘আমি যা কিছু করি, সবকিছু আমার পরিবারের জন্য। আমার বাবা-মা, আমার প্রেমিকা, আমার মেয়ে, আমার ভাই এবং দেশের বন্ধুÑসবার জন্য।’

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্পোর্টসনেট কানাডাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্টিফেনের বড় ভাই এবং ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও বলেন, দুই ভাই সচেতনভাবেই শোককে শক্তিতে রূপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাউরো বলেন, ‘আমাদের বাবা-মা আমাদের ডানা দিয়েছিলেন। তাই এখন ওড়ার দায়িত্বটা আমাদের নিজেদেরই।’
কানাডা জাতীয় দলে খেলার আগে পর্তুগালের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছিলেন স্টিফেন। দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় কোন দেশের হয়ে খেলবেন সেটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। ২০১৯ সালে পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়েও খেলেন এবং ২০১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে অংশ নেন। তবে একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্থায়ীভাবে কানাডার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর কনকাকাফ নেশনস লীগে জাতীয় দলে অভিষেক হয় স্টিফেনের। ২০২১ গোল্ড কাপে তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ কনকাকাফ নেশনস লীগের ফাইনাল এবং পোর্তোর হয়ে ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও খেলেছেন এই মিডফিল্ডার। নিয়মিত অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস ইনজুরিতে ছিটকে যাওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কানাডাকে নেতৃত্ব দেন স্টিফেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘এই জয়টা পাওয়ার জন্য আমরা জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছি। আমরা এই ঐতিহাসিক জয় সব কানাডিয়ানের উদ্দেশে উৎসর্গ করতে চাই।’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন