গ্রুপ পর্বে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে বিভিন্ন দল জায়গা করে নিয়েছে শেষ ৩২-এ। কোনো ম্যাচে ছিল গোলবন্যা, কোথাও ছিল চমক আর শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা। এখন থেকে প্রতিটি ভুলই হতে পারে বিদায়ের কারণ। নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচ মাঠে গড়াবে আজ মধ্যরাতে। যেখানে ‘এ’ গ্রুপ রানার্সআপ দক্ষিণ আফ্রিকা মুখোমুখি হবে ‘বি’ গ্রুপ রানার্সআপ কানাডার। নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই এখন ‘করো বা মরো’। এরপর ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল। সবশেষে ১৯শে জুলাই ফাইনালের মাধ্যমে পর্দা নামবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরের।
নতুন ফরম্যাট অনুযায়ী প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থানের দল পেয়েছে পরবর্তী রাউন্ডে। ফলে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত বেশির ভাগ গ্রুপেই ছিল সমীকরণের লড়াই, যা বিশ্বকাপকে দিয়েছে অতিরিক্ত নাটকীয়তা। গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ফ্রান্স। তিন ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে দলটি নিজেদের আধিপত্য স্পষ্ট করেছে। আক্রমণ ও রক্ষণ- দুই বিভাগেই ভারসাম্য রেখে তারা প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে পুরো সময় জুড়ে। বিশেষ করে শেষ ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে জয় তাদের শিরোপা জয়ের দাবিকে আরও শক্ত করেছে। স্পেনও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। খুব বেশি গোল না করলেও দলটি খেলেছে নিয়ন্ত্রিত ও পরিণত ফুটবল।
রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা তাদের গ্রুপ সেরা হতে সাহায্য করেছে। উরুগুয়ের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ জয় তুলে নিয়ে তারা নকআউটে যাওয়ার আগে আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে। প্রত্যাশা মতো এগিয়েছে ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস ও আর্জেন্টিনা। বিশেষ করে ব্রাজিল। প্রথম ম্যাচে মরোক্কোর সঙ্গে ড্র করার পর সমালোচনায় বিদ্ধ হতে হয়েছিল। তবে পরের দুই ম্যাচে হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দেখানো নৈপুণ্য তাদের শিরোপার দাবিদার করে তুলেছে। স্বভাবসুলভ ফুটবল খেলেছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। হ্যাটট্রিকসহ পাঁচ গোল করে লিওনেল মেসি এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। বসেছেন সর্বোচ্চ চূড়ায়। মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বাধিক ১৬ গোল ছাপিয়ে বিশ্বকাপে মেসির গোল সংখ্যা এখন ১৮। গোল করছেন বিশ্বের নামি-দামি সকলে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্দ, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, মোহাম্মদ সালাহ থেকে হ্যারি কেইন সবাই ফর্মে আছেন। অন্যদিকে এবারের গ্রুপ পর্বের অন্যতম বড় হতাশার নাম উরুগুয়ে।
অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দলটি একটিও ম্যাচ জিততে পারেনি। মাঝারি শক্তির দলগুলোও আলোচনায় এসেছে। নতুন ফরম্যাট তাদের সুযোগ দিয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কয়েকটি দল নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছে। এই তালিকায় আলোচিত নাম কেপ ভার্দে। সৌদি আরবকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দেশটি। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সবমিলিয়ে গ্রুপ পর্বে দেখা গেছে দুই ভিন্ন চিত্র- একদিকে বড় দলগুলোর নিয়ন্ত্রিত অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত দলগুলোর সাহসী লড়াই। এখন শুরু হচ্ছে নকআউট পর্ব, যেখানে আর কোনো ভুলের সুযোগ নেই। একটি ম্যাচই নির্ধারণ করবে স্বপ্ন বাঁচবে নাকি শেষ হবে বিশ্বকাপ যাত্রা।
যে যাত্রায় আজ প্রথম দল হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম স্বাগতিক কানাডা। গ্রুপ ‘এ’ থেকে মেক্সিকোর সঙ্গে নকআউট পর্বে উঠেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রুপ ‘বি’ থেকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গী হয়েছে কানাডা। এই গ্রুপের সেরা তৃতীয় দল হিসেবে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে। গ্রুপ ‘সি’ থেকে ব্রাজিল ও মরক্কো সরাসরি উঠেছে। গ্রুপ ‘ডি’ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া শীর্ষ দুই দল হিসেবে জায়গা করেছে। প্যারাগুয়েও সেরা তৃতীয় দলের একটি হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে।
গ্রুপ ‘ই’ থেকে জার্মানি ও আইভরি কোস্টের সঙ্গে উঠেছে ইকুয়েডর। জার্মানিকে হারানো জয়ই ইকুয়েডরের নকআউট পথ খুলে দেয়। গ্রুপ ‘এফ’ থেকে নেদারল্যান্ডস ও জাপান সরাসরি উঠেছে। সুইডেন ৪ পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দলের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। গ্রুপ ‘জি’ থেকে বেলজিয়াম ও মিশর শীর্ষ দুইয়ে থেকে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। তিন ম্যাচের তিনটিই ড্র করে অপেক্ষায় ইরান। গ্রুপ ‘এইচ’ দিয়েছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্পগুলোর একটি। স্পেন গ্রুপসেরা, আর তিন ম্যাচে তিন ড্র করে দ্বিতীয় হয়ে ইতিহাস গড়েছে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপ অভিষেকেই শেষ ৩২-এ উঠেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি। গ্রুপ ‘আই’ থেকে ফ্রান্স ও নরওয়ে সরাসরি শেষ ৩২-এ গেছে। সেনেগাল ৫-০ গোলে ইরাককে হারিয়ে সেরা তৃতীয় দলের একটি হিসেবে জায়গা নিশ্চিত করেছে। গ্রুপ ‘জে’ থেকে আর্জেন্টিনা আগেই শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে। তবে দ্বিতীয় স্থান এবং তৃতীয় দলের হিসাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। গ্রুপ ‘কে’ থেকে কলম্বিয়া ও পর্তুগাল শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে।
শেষ ৩২-এ কে কার মুখোমুখি হচ্ছে
আজ মধ্যরাতে ‘এ’ গ্রুপের রানার্সআপ দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে ‘বি’ গ্রুপ রানার্সআপ কানাডা। আগামীকাল গ্রুপ ‘সি’-এর চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল মুখোমুখি হবে গ্রুপ ‘এফ’-এর রানার্সআপ জাপানের। পরে গ্রুপ ‘ই’-এর সেরা দল জার্মানি মুখোমুখি হবে গ্রুপ ‘ডি’-এর তৃতীয় দল প্যারাগুয়ের। একইদিন গ্রুপ ‘এফ’ সেরা নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হবে গ্রুপ ‘সি’ রানার্সআপ মরোক্কোর। গ্রুপ ‘ই’-এর রানার্সআপ আইভোরি কোস্ট নামবে ‘আই’ গ্রুপের দ্বিতীয় দল নরওয়ের বিরুদ্ধে। আগামী ১লা জুলাই গ্রুপ ‘আই’ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স মুখোমুখি হবে ‘এফ’ গ্রুপের সেরা তৃতীয় দল সুইডেনের। গ্রুপ ‘এ’-এর সেরা দল মেক্সিকো লড়বে গ্রুপ ‘সি’, ‘ই’, ‘এফ’, ‘এইচ’ ও ‘আই’ থেকে তৃতীয় হওয়া একটি দলের।
এখানে তৃতীয় সেরা দল হিসেবে আসতে পারে ইকুয়েডর। ২রা জুলাই গ্রুপ ‘জি’ চ্যাম্পিয়ন বেলজিয়াম ‘এ’, ‘ই’, ‘এইচ’, ‘আই’ ও ‘জে’ থেকে তৃতীয় হওয়া একটি দলের মুখোমুখি হবে। এখানে আসতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া, সেনেগাল, আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার একটি দল। গ্রুপ ‘ডি’ চ্যাম্পিয়ন যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হবে গ্রুপ ‘বি’ থেকে তৃতীয় হয়ে কোয়ালিফাই করা বসনিয়ার। ৩রা জুলাই গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে চ্যাম্পিয়ন স্পেন মুখোমুখি হবে গ্রুপ ‘জে’ থেকে দ্বিতীয় হওয়া দলের। এক্ষেত্রে অস্ট্রিয়া বা আলজেরিয়া তাদের প্রতিপক্ষ হবে। গ্রুপ ‘বি’ থেকে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সুইজারল্যান্ড লড়বে ‘ই’, ‘এফ’, ‘জি’, ‘আই’ ও ‘জে’ গ্রুপ থেকে তৃতীয় হওয়া যেকোনো একটি দলের। গ্রুপ ‘ডি’ থেকে দ্বিতীয় হওয়া অস্ট্রেলিয়া আগামী ৪ঠা জুলাই মুখোমুখি হবে ‘জি’ গ্রুপের দ্বিতীয় দল মিশরের। একই রাতে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে এবারের বিশ্বকাপে নতুন আসা কেপ ভার্দের।
