বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার ঘোষণা এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি চীন সফরে। দুই দেশ যৌথভাবে ‘চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ আ শেয়ার্ড ফিউচার ইন দ্য নিউ ইরা’- গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা এতদিনের ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ থেকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘২+২ সংলাপ’ শুরুর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন কাঠামো তৈরি করবে।
একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তিস্তা নদীর ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতেও দুই দেশ একমত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান- পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, আগের যে কোনো সফরের তুলনায় এবার মালয়েশিয়া ও চীন সফরে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে এবং এর মাধ্যমে দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত ২১শে জুন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের আমন্ত্রণে সরকার প্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে কুয়ালালামপুর যান তিনি। সফরটি ছিল সংক্ষিপ্ত। ১৮ ঘণ্টার মালয়েশিয়ার সফর শেষে ২২শে জুন চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সামার দাভোসে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। ২৪ থেকে ২৬শে জুন বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপল্স কংগ্রেসের চেয়ারম্যান ঝাও ল্যাজির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। সফর শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি বিস্তৃত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশ নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো- কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘২+২ সংলাপ’ চালুর বিষয়ে একমত হওয়া। এই ব্যবস্থায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, কৌশলগত যোগাযোগ ও আঞ্চলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন।
যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রতিনিধিদলের সফর, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে পারস্পরিক সমন্বয় আরও বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে চীন আশ্বস্ত করেছে এবং এ খাতে বাস্তব সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীন সর্বাত্মক সহায়তা দেবে এবং দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা দ্রুত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করবেন।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, জলসম্পদ পরিকল্পনা, নদী খনন, দুর্যোগ প্রশমন, হাইড্রোলজিক্যাল পূর্বাভাস এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও গভীর করা হবে। দুই দেশ মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল দ্রুত বাস্তবায়নে একমত হয়েছে।
এ ছাড়া উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট জনকল্যাণমূলক প্রকল্পেও সহযোগিতা বাড়ানো হবে। আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে কুনমিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর মাল্টিমোডাল যোগাযোগ এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
চীন সফরে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে ৮টি সমঝোতা স্মারক, ৩টি চুক্তি, ১টি প্রটোকল ও ১টি যৌথ কর্মপরিকল্পনা স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা এবং বিডার সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানের দু’টি চুক্তি ও একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ আবারো এক-চীন নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে বলেছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’র যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করবে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে।
চীন বাংলাদেশকে ব্রিকসে অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর অংশীদার হওয়ার আবেদনে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক ফোরামে সমন্বয় জোরদার এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বৈশ্বিকীকরণের পক্ষে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে চীন। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে চীন তার সক্ষমতার সর্বোচ্চ দিয়ে সহায়তা করবে।
দুই দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সবুজ জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, যুব ও ক্রীড়া, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগও অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে কী পেলো ঢাকা: পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়া সফরে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক এবং সন্ত্রাসবাদ দমন ও বিনিয়োগ সহযোগিতা নিয়ে দু’টি নথি বিনিময় হয়েছে। দুই দেশ দ্রুত মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা শুরু করে ২০২৭ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠক পুনরায় চালু, যৌথ বিজনেস কাউন্সিল গঠন, জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, বৈদ্যুতিক যান, বন্দর ও লজিস্টিকসে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে।
শ্রমবাজারের বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু, আট হাজার কর্মীর যোগদান, দক্ষ জনশক্তি পাঠানো, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, বাংলাদেশের আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রচেষ্টা এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রত্যাবাসন এগিয়ে নিতে মালয়েশিয়া সমর্থন জানিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ: দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সামার দাভোসে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই প্রধানমন্ত্রীকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ করেন তিনি। বিডা চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে তেল, গ্যাস ও অবকাঠামো খাতে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। একইসঙ্গে হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
চীন সফর প্রসঙ্গে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, প্রায় ৮০ জন চীনা উদ্যোক্তাকে নিয়ে বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন- বাংলাদেশ ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে এবং এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
