প্রশান্ত মহাসাগরে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে চীন দীর্ঘদিন ধরে ‘সালামি-স্লাইসিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ‘সালামি স্লাইসিং’ হলো একটি ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল, যেখানে কোনো বড় লক্ষ্য বা বিশাল ভূখণ্ড একবারে দখল না করে, অত্যন্ত চতুরতার সাথে ধীরে ধীরে ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। সহজ কথায়, একটি আস্ত সালামি সসেজ (মাংসের তৈরি রোল) যেমন একবারে না খেয়ে পাতলা পাতলা টুকরো করে কেটে খাওয়া হয়, এই কৌশলটিও ঠিক সেরকম। আন্তর্জাতিক আইনকে পাস কাটিয়ে করে সরাসরি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না করেই বিতর্কিত অঞ্চলগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে চীনের জাহাজগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে রেকর্ড দূরত্বে গিয়ে ‘আইন প্রয়োগকারী’ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। নিজেদের উপকূল থেকে পাঁচশো মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত একটি বিতর্কিত লেগুনের ভেতরে ‘গবেষণা’ চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের কাছে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখা হিসেবে পরিচিত ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’-এর বাইরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর একটি বড় চেষ্টা এটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পরপরই চীনের এই সামুদ্রিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সেই সফরটি বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। তবে চীনের নেতা শি জিনপিং স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, মার্কিন-চীন সম্পর্কের অবনতির সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান।
চীন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়েছে তাইওয়ানকে সামরিক সহয়তা করার ক্ষেত্রে। চলতি মাসের শুরুতে চীনের মেরিটাইম সেফটি এজেন্সির (এমএসএ) তিনটি বেসামরিক আইন প্রয়োগকারী জাহাজ ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী চ্যানেল দিয়ে গিয়ে তাইওয়ানের পূর্ব দিকের জলসীমায় টহল ও মানচিত্র তৈরির কাজ শুরু করে। পর্যবেক্ষকদের মতে এটিই প্রথম কোনো এমএসএ জাহাজের এই সীমানা অতিক্রমের ঘটনা। এই পদক্ষেপ তাইওয়ানের ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ ও সতর্কবার্তা।
চীনের আধা-সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, তারা প্রথমবারের মতো তাইওয়ানের পূর্ব সমুদ্র সৈকতের তলদেশের মানচিত্র তৈরি করেছে এবং এই জলসীমা এখন থেকে চীনের ‘নিকটবর্তী জলসীমা’ হিসেবে গণ্য হবে, যেখানে তাদের পূর্ণ শাসনভার চলবে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং’তে এই অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, বেইজিংয়ের আসল উদ্দেশ্য হলো সাম্রাজ্য বিস্তার করা এবং তাইওয়ান তথা ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি চীনের হুমকি। একজন তাইওয়ানিজ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীন এই বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করে দেখাতে চাইছে যে তাইওয়ানের ওপর তাদের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামরিক বাহিনীর চেয়ে এই বেসামরিক ও অ-সামরিক জাহাজগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্ট্যাটাস কো বা স্থিতাবস্থার জন্য বেশি বিপজ্জনক। কারণ এগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে কম হুমকিস্বরূপ মনে হয়।
প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে রেডিওর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা হলেও পরবর্তী ধাপে চীন তাইওয়ানে আসা জাহাজগুলোকে আটকে দিতে পারে বা চীনের বন্দরে যেতে বাধ্য করতে পারে। এটি তাইওয়ানে আসা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহী জাহাজগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট চীনের এই আচরণকে ‘গভীরভাবে অস্থিতিশীল’ বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি এক যৌথ বিবৃতিতে এই অঞ্চলের নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক শিপিংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সাথে দক্ষিণ চীন সাগরের স্কারবোরো শোল অঞ্চলেও চীন তাদের আধিপত্য বাড়াচ্ছে।
ফিলিপাইনের নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে থাকা সত্ত্বেও চীন সেখানে কৃত্রিম ভাসমান কাঠামো তৈরি করেছে, যা স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছে। ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সচিব গিলবার্ট তেওদোরো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে চীন আগেও দ্বীপ তৈরি করে সামরিক ঘাঁটি বানানোর বিষয়ে মিথ্যা বলেছিল এবং এবারও তারা গবেষণার নামে জালিয়াতি করছে। ওয়াশিংটন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফিলিপাইনকে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার মূল্যের চারটি সামুদ্রিক ড্রোন সরবরাহ করেছে। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর ও জোরালো প্রতিরোধ না থাকলে চীন এভাবেই একটু একটু করে পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে।
