‘ডাইনি বাহিনী’র হানিট্র্যাপে কুপোকাত রুশ সেনারা

‘ডাইনি বাহিনী’র হানিট্র্যাপে কুপোকাত রুশ সেনারা

ফন্ট সাইজ:

ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ চার বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে। এটি এখন শুধু সামনের সারির যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে প্রতিরোধ এখন অনেকটাই অদৃশ্য, সেখানে এখন ছায়ার মধ্যে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতে যেখানে প্রকাশ্য প্রতিবাদ, প্রতীকী প্রতিরোধ ও ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্বকে নাড়া দেয়া হয়েছিল, এখন সেই প্রতিরোধ আরও গোপন, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নিখুঁতভাবে সংগঠিত।
বহুল প্রচারিত এক ভিডিওতে দেখা গেছে, এক ইউক্রেনীয় বৃদ্ধা রুশ প্যারাট্রুপারের হাতে সূর্যমুখীর বীজ দিয়ে বলছেন, এখানে তোমার মৃত্যুর পর সূর্যমুখী ফুটবে। সেই দৃশ্য এক সময় বিশ্বজুড়ে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই প্রতিরোধের ধরন বদলে গেছে।

প্রেমের ছদ্মবেশে গুপ্তচরবৃত্তি ও ড্রোন হামলা
ইউক্রেনের দখলকৃত ভূখণ্ডে অবস্থানরত এক রুশ সেনা কয়েক মাস ধরে বিশ্বাস করছিলেন যে, তিনি অনলাইনে একাকী এক ইউক্রেনীয় গৃহবধূর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। তারা ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট কথা ভাগ করছিল, যা এক ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের রূপ নেয়।
কিন্তু এক পর্যায়ে, সেই “নারী” তাকে নিজের অবস্থানের একটি ছবি পাঠাতে অনুরোধ করে। এরপর সেই রুশ সেনা ছবি পাঁঠায়। সেই ছবির পেছনে অস্পষ্টভাবে একটি মানচিত্র দেখা যায়। সেই তথ্য বিশ্লেষণের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওই অবস্থানে ড্রোন হামলা হয়।
পরবর্তীতে জানা যায়, ওই নারী আসলে বাস্তব ব্যক্তি ছিলেন না- তিনি ছিলেন ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর এক পুরুষ সদস্য, যিনি ছদ্মবেশে এই অভিযান পরিচালনা করছিলেন। এই তথ্য দ্য আটলান্টিকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

‘বিদমা’ ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের ‘ডাইনি’
ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ কাঠামোর মধ্যে এক বিশেষ শব্দ এখন বারবার উঠে আসছে- ‘বিদমা’, যার অর্থ লোককথায় “ডাইনি” বা জাদুকরী নারী। তবে এখানে এটি অপমান নয়, বরং এমন নারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যাদের কাছে গোপন তথ্য ও স্থানীয় জ্ঞান রয়েছে।
দখলকৃত অঞ্চলে ইউক্রেনের নারীরা রাশিয়ান চেকপয়েন্ট পার হয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন, হাসপাতাল, স্কুল ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে কাজ করছেন, আবার একই সঙ্গে প্রতিটি তথ্য সংগ্রহ করছেন- কে কোথায় আছে, কোন ভবন কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সবকিছু।

একজন সাবেক ইউক্রেনীয় সংসদ সদস্য লেসিয়া ওরোবেটস জানান, এই নারীরা ইতিহাসে জ্ঞান রাখার কারণে একসময় নিপীড়নের শিকার হলেও এখন তারা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মারিউপোল থেকে পালিয়ে আসা এক প্রতিরোধ কমান্ডার পেত্রো অ্যান্ড্রিউশচেঙ্কো দ্য আটলান্টিককে বলেন, নারীরা এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা এমন জায়গায় যেতে পারে যেখানে পুরুষরা পারে না, এবং তারা অনেক সময় বেশি নির্ভীক ও নির্মমও হতে পারে।

খেরসন থেকে পালিয়ে আসা এক নারীর গল্প
রক্সানা (ছদ্মনাম), খেরসনের একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন যুদ্ধ শুরুর আগে। রুশ বাহিনী ওই এলাকা দখল করার পর তিনি সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং পালিয়ে যান।
পালানোর পথে তাকে ৩৩টি রুশ চেকপয়েন্ট পার হতে হয়। তার বর্ণনায়, অনেক জায়গায় লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন, যাদের মধ্যে নারীদের শরীরে যৌন সহিংসতার স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। এক পর্যায়ে তার গাড়িতে গুলি করা হলে একজন সহযাত্রী আহত হন।
বর্তমানে তিনি বিদেশে থাকেন এবং ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের জন্য “টার্গেট ভেরিফায়ার” হিসেবে কাজ করেন। অর্থাৎ, কোন ভবন বা স্থাপনা সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না- তা নিশ্চিত করতে তিনি স্থানীয় জ্ঞান ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, আমরা গুদাম আবার তৈরি করতে পারব। কিন্তু রাশিয়ানরা রুশদের ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

অনলাইন ফাঁদ ও হানিট্র্যাপ অপারেশন
ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সেরহি এমন এক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন যেখানে রুশ সৈন্যদের অনলাইনে প্রেম বা সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই পদ্ধতিকে হানিট্র্যাপ বলা হয়।
দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা এ ধরনের অনলাইন মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহারে প্রশিক্ষিত কাঠামো গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে চেচেন সৈন্যদের এই ধরনের ফাঁদে ফেলা তুলনামূলকভাবে কঠিন বলে জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের ৪২৬তম আনম্যানড সিস্টেম রেজিমেন্টের এক কমান্ডার জানান, দখলকৃত অঞ্চলে প্রতিরাতেই ড্রোন অভিযান পরিচালিত হয়। প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যই এসব হামলার ভিত্তি। কিছু ক্ষেত্রে, তথ্য পাঠানোর মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই ড্রোন হামলা ঘটে।

আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক সময় যে ব্যক্তি তথ্য দিচ্ছেন, তিনি তখনো রুশ সেনাদের সঙ্গে অনলাইনে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই হামলা ঘটে।
এই প্রতিরোধ কাঠামোর মূল লক্ষ্য শুধু সামরিক ক্ষতি নয়, বরং রুশ সেনাদের মধ্যে স্থায়ী ভয় ও সন্দেহ তৈরি করা। ইউক্রেনের প্রতিটি সাধারণ মানুষ- বৃদ্ধা, ডাক্তার, বাসচালক বা বাজারের মানুষ- সবাইকে সম্ভাব্য প্রতিরোধক হিসেবে দেখার মানসিক চাপ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।

ইউক্রেনের একজন অপারেটিভ “সেস্ত্রা” বলেন, তিনি চান প্রতিটি রুশ সেনা সবসময় আতঙ্কে থাকুক। কারণ তারা জানবে না, কে তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর শুধু সামনের সারির লড়াই নয়। এটি তথ্য, মনস্তত্ত্ব, অনলাইন প্রতারণা এবং ড্রোন প্রযুক্তির এক জটিল যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন। কখনো গুপ্তচর হিসেবে, কখনো তথ্য বিশ্লেষক হিসেবে, আবার কখনো প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে।
এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে এক নতুন ধরনের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। যেখানে অস্ত্রের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তথ্য, পরিচয় গোপন রাখা এবং এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন