বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাবেন কিনা সেই নিয়ে সংশয় ছিল। তিন মাস আগে ঘানার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বদলি নেমে করেন জয়সূচক গোল। তবুও কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের মনে সেভাবে ঠাঁই করে নিতে পারেননি ডেনিজ উনদাভ। শুরুর একাদশে তার নামার ইচ্ছাকে স্রেফ উড়িয়ে দেন জার্মানির হেড কোচ। উনদাভ থেমে যাননি। নিজের সঙ্গে নিজে লড়ে গেছেন। লড়াকু মানসিকতাই তাকে এনে দিয়েছে সাফল্য। বদলি হিসেবে মাঠে নেমে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়া জার্মানিকে জোড়া গোল করে এনে দিয়েছেন অবিশ্বাস্য এক জয়। এ জয়ে এক যুগ পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পা রাখলো চার বারের চ্যাম্পিয়নরা। এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে কুরাসাওয়ের বিপক্ষেও দারুণ ফুটবল উপহার দেন উনদাভ। এক গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেন স্টুটগার্ড ফরোয়ার্ড। শরণার্থী পরিবারে জন্ম নেয়া উদনাভ একসময় কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন। সেই কষ্টের জীবনকে জয় করে বিশ্বকাপ ‘হিরো’ ৩০ বছর বয়সী এ ফুটবলার।
উনদাভের জন্য জার্মানির জার্সি গায়ে জড়ানোর পথটা মসৃণ ছিল না। জীবনের প্রতিটি বাঁকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছেন। ১৯৯৬ সালের ১৯শে জুলাই জার্মানির ভারেল শহরে জন্ম নেন উনদাভ। ব্রেমেন শহরের কাছে ছোট্ট শহর আখিমে বেড়ে উঠা। কিন্তু তার পরিবারের শিকড় জার্মানি থেকে হাজার মাইল দূরের এক গ্রামে। উনদাভের বাবা-মা তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উরফা প্রদেশের ভিরানশেহির এলাকার ইশিকলি নামের একটি গ্রামের বাসিন্দা। ধর্মীয় পরিচয়ে তারা ইয়াজিদি কুর্দি সম্প্রদায়ের মানুষ। যারা মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রাচীন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। বারবার নিপীড়নের শিকার আর বাস্তুচ্যুতির গল্পে ভরা। ১৯৮০ সালে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। সেই অস্থির সময়ে দেশ জুড়ে নেমে আসে কঠোর দমন-পীড়ন।
সেই সময় চাপের মুখে পড়ে ইয়াজিদি সম্প্রদায়। নিরাপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বহু ইয়াজিদি পরিবার তখন নিজেদের পৈতৃক ভিটা ছেড়ে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়। উনদাভের দাদা তার জন্মভূমি ছেড়ে পাড়ি জমান জার্মানিতে। অচেনা একটি দেশে, অচেনা ভাষা আর সংস্কৃতির মধ্যে নতুন করে জীবন গড়ার সংগ্রাম শুরু হয় পরিবারটির। সেই অভিবাসী যাত্রার পরের প্রজন্মেই জন্ম নেন দেনিজ উনদাভ। তার ভাই রোকাতও ফুটবল খেলেন, স্থানীয় ক্লাব টিএসভি আখিমের হয়ে। বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা উনদাভের জন্য ফুটবল ছিল পরিবারকে কিছু একটা ফিরিয়ে দেয়ার স্বপ্নও। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ভেরডার ব্রেমেনের যুব একাডেমি থেকে বাদ দেয়া হয় তাকে। কারণ হিসেবে বলা হয়, উনদাভের শারীরিক উচ্চতা যথেষ্ট নয়। সেই প্রত্যাখ্যান তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। তবে হাল ছাড়েননি। ১৭ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে চতুর্থ স্তরের ক্লাব হাভেলসেতে যোগ দেন। ফুটবল থেকে আয় যথেষ্ট না হওয়ায় কারখানায় লেজার মেশিন চালানোর কাজ নিতে হয়। দিনে আট ঘণ্টার শিফটে কাজ করতেন। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কারখানায় যাওয়া, এরপর অনুশীলন, রাত আটটায় বাড়ি ফেরা- এভাবেই দিনের পর দিন কেটেছে তার কিশোর জীবন। কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জার্মানির হয়ে খেলা প্রথম ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত ফুটবলার তিনি। শনিবার রাতের ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান তিন বদলি খেলোয়াড় নামান। মাঠে নামেন জেমি লিউলি,আমেরি ও উনদাভ। সেই সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ৬৮ মিনিটে নাদিম আমিরির ক্রস থেকে ডেনিজ উনদাভ চমৎকার ভলিতে জার্মানিকে সমতায় ফেরান। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে সবাই যখন ড্রয়ের প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই আইভরি কোস্টের রক্ষণভাগকে বোকা বানিয়ে নিজের দ্বিতীয় ও দলের জয়সূচক গোলটি করেন উনদাভ। জাতীয় দলের হয়ে ১১ ম্যাচে এটি তার নবম গোল। চলতি বিশ্বকাপে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে এখন পর্যন্ত ৫টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন ডেনিজ উনদাভ (৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট)।
বিশ্বকাপে ১৯৬৬ সালের পর থেকে কোনো এক আসরে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে এটিই সর্বোচ্চ গোল বা অ্যাসিস্টের রেকর্ড। এর আগে ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের রজার মিলা এই কীর্তি গড়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ২০০২ সালে মিরোস্লাভ ক্লোসার পর জার্মানির প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে গোল করলেন উনদাভ। ইকুয়েডরের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে উনদাভকে খেলানো হবে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে কোচ নাগেলসম্যান বলেন, ‘অবশ্যই। কেন আমি তার ছন্দ নষ্ট করতে যাবো? সে দুবার বদলি হিসেবে নেমেছে, দু’বারই গোল করেছে।’
