নগদ টাকা-স্বর্ণালংকারসহ বাসায় রাখা সম্পদের লোভেই রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনী কর্মকর্তার স্ত্রী ফারাহ দীবাকে নিজ ফ্ল্যাটে হত্যা করে দারোয়ান ও গাড়িচালক। ঘটনার প্রায় দুই বছর পর বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়ার কোর্ট স্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিহত ফারাহ দীবার গাড়িচালক মো. সবুজ বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিনের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং-এর পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২৭শে অক্টোবর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনী কর্মকর্তা উইং কমান্ডার কাজী আব্দুল মতিনের স্ত্রী ফারাহ দীবাকে নিজ ফ্ল্যাটে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ওই বছরেরই ২৮শে অক্টোবর বাসার সিকিউরিটি গার্ড মো. মিলন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তবে আত্মগোপনে চলে যায় মূল অপরাধী গাড়িচালক সবুজ বিশ্বাস। দীর্ঘদিন সে নিজের নাম-পরিচয় গোপন করে একের পর এক এলাকা পরিবর্তন করতে থাকে। অবশেষে দীর্ঘ দুই বছর পর সেই গাড়িচালক সবুজ বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। সবুজের বরাত দিয়ে র্যাবের এই মুখপাত্র বলেন, সবুজ বিশ্বাস নিহত ফারাহ দীবার গাড়িচালক হওয়ায় সে ওই বাসার সবকিছু জানতো। এমনকি গাড়িতে বসে কখন কার সঙ্গে কি কথা হতো, তার বাসায় কি কি আছে সব জানতো। এমনকি কবে বাসায় কেউ থাকবে না সেটাও সে জেনে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বাসার সিকিউরিটি গার্ড মো. মিলন মিয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করে ঘটনার দিন ফারাহ দীবার বাসায় প্রবেশ করে তারা। সেদিন বাসায় কেউ ছিল না। তিনি একাই ছিলেন। এই সুযোগে সেদিন বাসায় ঢুকে প্রথমে দীবার রুমে ঢুকে তার পেছন থেকে জাপটে ধরে রুমের মেঝেতে ফেলে সবুজ বিশ্বাস দীবার পিঠের ওপরে বসে মুখ চাপা দিয়ে ধরে। এরপর মিলন মিয়া দীবার দুই-হাত এবং দুই-পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে। ওই সময় মিলন তার কাছে থাকা গামছা দিয়ে দীবার মুখ বাঁধে। এর ফলে দীবার নাক ও মুখ দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তখন তারা দু’জন দীবার নাক ও মুখ চেপে ধরে শ্বাস রোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সবুজ বিশ্বাস বাসার আলমারি খুলে নগদ টাকা এবং স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়। তারা দু’জনেই স্বীকার করেছে যে তারা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটের উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তদন্তেও তা প্রমাণিত হয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী দেশের সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের অনুরোধ আপনার যারা বাসার নিরাপত্তার দায়িত্বে কাজের লোক, দারোয়ান বা গাড়িচালক নিয়োগ করেন তারা অবশ্যই তাদের বিষয়ে যথাযথ যাচাই বাছাই করে তারপরই নিয়োগ করবেন। তাদের সকলের জাতীয় পরিচয়পত্র নিজেদের কাছে রাখবেন। কারণ আপনাদের অজান্তেই এরা আপনার বাসার সবকিছু সম্পর্কে অবগত থাকে।
তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ন্যায় র্যাব ফোর্সেসও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সকল চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ এবং হত্যাসহ আরও বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয় সে সকল অপরাধগুলোকে প্রতিহত করতে র্যাব ফোর্সেস নিরলসভাবে তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিটি অপরাধের ঘটনাতেই আসামিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে এই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনা বৃদ্ধি হলে সমাজের এই অপরাধ প্রবণতা আরও অনেকগুণ কমে আসবে। তিনি বলেন, যেখানেই ছিনতাই-চাঁদাবাজি বা অনান্য অপকর্ম হোক না কেন- দেখবেন এই অপকর্মকারীদের সংখ্যা কিন্তু কম। বেশির ভাগ স্থানেই দেখা যায় জনসাধারণের সামনেই অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে। এই দু’-একজন বা মুষ্টিমেয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে যদি তৎক্ষণাৎ আশপাশের মানুষ এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করে বা সোচ্চার হয়- তাহলে দেখবেন তারা আর সাহস পাবে না। তাই সমাজের অপরাধ রোধে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
