আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?

ফন্ট সাইজ:

ফুটবলের চেয়ে জনপ্রিয় আর কি কিছু আছে? চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় নেচে ওঠে বিশ্ব। সারা বিশ্ব এক হয়ে যায়। ছোট থেকে বড় সকলেই নেচে ওঠে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে বিশ্বকাপের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এবারের বিশ্বকাপে আটচল্লিশটি দল অংশ নিচ্ছে। চমৎকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়ে গেল মেক্সিকোতে। বিশ্বখ্যাত পপ সংগীতশিল্পী সাকিরার দাই দাই গানে মুখরিত ওঠে বিশ্ব। ফুটবল খেলায় পুরো বিশ্ব এক হয়ে যায়।

বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লা, শহর-বন্দর, চায়ের দোকান সবখানেই আলোচনা, কে হবে এবারের ফিফা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন-২০২৬? তবে বাংলাদেশে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সাপোর্টার বেশি। পাশাপাশি স্পেন, জার্মানি, পর্তুগাল, মরক্কো, ইরান, ইতালিরও অনেক সাপোর্টার রয়েছে। লাতিন আমেরিকার ছন্দময় ফুটবলে মাতোয়ারা বিশ্ব। এর পাশাপাশি গতির ফুটবল খেলে ইউরোপ। ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে পাগলামির সীমা নেই। মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন ২০০৬ সাল থেকে জার্মানির পতাকা বানিয়ে আসছেন। এবছর তিনি ৩০ শতাংশ জমি বিক্রি করে বানিয়েছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার জার্মানির পতাকা। এটাকে অতি পাগলামি ভাবলেও ভক্তের ভালোবাসা বলে কথা! এখানে আবেগ আছে, ভালোবাসা আছে। জার্মানির আরেক ভক্ত নাটোরের সাগর, আরেক ধাপ এগিয়ে আছেন। তিনি তার পুরো বাড়ি সাজিয়েছেন জার্মানির পতাকার রংয়ে। আশপাশের অনেকেই এখন সেই বাড়ি দেখতে আসছেন। বাঙালির আবেগ আছে, আছে ভালোবাসা।

প্রত্যেকবার যখন বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয় তখন বলা হয় গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। গত বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলা দেখেছিল ৫ শত কোটি দর্শক। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। একই সঙ্গে এত মানুষ মেসির পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে এটা একটি বিস্ময়কর ব্যাপার। পৃথিবীতে যত ঘটনাই ঘটুক ফুটবল খেলার মতো এতটা জনপ্রিয় আর কোনোকিছু হয়নি। ফুটবল খেলা এমনই এক খেলা যে খেলা পুরো বিশ্বকে এক করে ফেলে। এই যে আমরা জানি ইরান আর যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এরই মাঝে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। এশিয়ার দেশ ইরান বিশ্বকাপে টিকিট পেয়েছে।

অনেকেই ভেবেছিল ইরানকে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেবে না। কিন্তু ফুটবল বলে কথা। ইরানের ফুটবলারদের ঠিকই ভিসা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ এবছর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবলের এই ২৩তম আসর। জমজমাট এই আসরে আমরাও হয়তো একদিন খেলবো। আমাদের প্রজন্ম খেলবে। আমরা এখন বাছাই পর্বে খেলি, মূল পর্বে স্থান করে নিতে পারিনি। তবে আশার কথা হচ্ছে আগের চেয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ফুটবল দলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে হামজা চৌধুরী। জামাল ভুঁইয়া, ফাহমিদুল, জায়ান কিংবা শমিত সোমরা যোগ হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবলে। এদের যোগ হওয়াতে ফুটবল আপাতত লাভবান হলেও কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লাভবান হবে কিনা জানি না। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশকে ভালো করতে হলে ছোটদের থেকে শুরু করতে হবে।

অনেকেরই হয়তো মনে থাকার কথা ডানা কাপ-এর কথা। বাংলাদেশের তরুণরা আর্জেন্টিনার দামি ক্লাবকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল। ম্যারাডোনার মতো বিশ্বমাপের কিংবদন্তি খেলোয়াড় সেদিন বাংলাদেশের নাম জেনেছিল। আমরা সেই ধারাবাহিকতা রাখতে পারিনি। দু’একবার দক্ষিণ এশিয়ার শিরোপা জিতলেও সেটারও ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। আমাদের নারী ফুটবলাররাও বারবার তাদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সাফল্যের পর এশিয়া অঞ্চলেও তারা দারুণ পারফর্ম করেছে। সাফ ফুটবলে সেরার মুকুট পরা আর বিশ্বমঞ্চে যাওয়া অনেক পার্থক্য।

আমাদের ফুটবলকে অনেক দূর নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রাইমারি লেভেল থেকেই টিম গঠন করে ঠান্ডার দেশে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পেশাদার ফুটবলার গড়ে তোলা ছাড়া বিশ্ব আসরে সাফল্য পাওয়াটা কঠিন। বয়সভিত্তিক টিম গঠন করে তাদেরকে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণও দিতে হবে। এরা যখন বড় হবে তখন তারা একেকজন তারকা হিসেবে গড়ে উঠবে। মেসি, এমবাপ্পে, রোনালদো কিংবা নেইমার এত সহজে তৈরি হয়নি। যদিও লাতিন আমেরিকা কিংবা বিশ্বকাপে অংশ নেয়া বেশির ভাগ দেশই পেশাদার ফুটবল খেলে। আমাদের দেশেও পেশাদারিত্বের ফুটবলার বানাতে হবে। আর এই কাজ শুধু সরকারের দ্বারা করা অসম্ভব। বেসরকারি পর্যায়ে অনেককেই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে প্রাক্তন খেলোয়াড়েরাও সম্পৃক্ত হতে পারেন। আবার দেশের বিত্তবানেরা এগিয়ে আসতে পারেন। ক্রিকেটে আমরা এখন অনেক এগিয়ে আছি। এই তো চলতি সিরিজে আমরা অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দেশকে হারিয়েছি। একবার তো সামান্যর জন্য আমরা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলতে পারিনি। হয়তো আর বেশিদিন নয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে আরও চমক দেখাবে। নারী ক্রিকেটাররাও এগিয়ে যাচ্ছেন এটাও আশার কথা। একটা সময় ছিল আমরা ক্রিকেটে হারতাম কিন্তু আমাদের দেশকে সমর্থন করা ছাড়িনি। সেই ক্রিকেট এখন অনেক দূর গিয়েছে। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হয়ে টেস্ট মর্যাদাও পেয়েছে।

আরও পড়ুন:
ম্যাজিক মেসি

ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও আমরা চমক দেখাতে পারি যদি সেইভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়। সবচেয়ে প্রয়োজন সদিচ্ছার। একসময় আমরা দেখেছি ঢাকার মাঠে আবাহনী আর মোহামেডানের খেলা হলে দর্শক উপচে পড়েছে। কলকাতার মাঠেও ঠিক একই চিত্র দেখেছি। আমরা দলবেঁধে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখেছি। মাঝখানে ফুটবলে বেশ ভাটা পড়েছিল। আবারো যখন চাঙ্গা হচ্ছে তখন এটার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা উচিত। সরকার নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এটি বেশ প্রশংসার দাবি রাখে। আমাদের বাচ্চারা খেলাধুলা করবে, পড়ালেখা করবে।

মানুষের মতো মানুষ হবে। তাহলেই তো তারা দেশকে ভালোবাসবে। আমরা লড়াকু জাতি। সারা বিশ্বে কতো বাঙালি ছড়িয়ে আছে এদের ভেতর থেকে কি বিশজন খেলোয়াড় বের করা যায় না? আমরা যদি বলি সবার আগে দেশ, সেই দেশকে খেলাধুলায়ও অনেক দূর নিয়ে যেতে হবে। আমরা অপেক্ষায় আছি- আমাদের দেশে কবে সেই ছেলে হবে যার হাত ধরে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ ছড়াবে রং। তাহলে আমরাও দেখবো সারা বিশ্ব আমাদের দেশকে চিনবে ফুটবলের দেশ হিসেবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন