৪৮ দলের বিশ্বকাপে সবক’টি দেশই এরইমধ্যে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলে ফেলেছে। গ্রুপ পর্বের প্রথম রাউন্ডে ২৪ ম্যাচে গোল হয়েছে ৭৫টি। এক ম্যাচে সর্বাধিক ৭ গোল করেছে চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। নবাগত কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ওই ম্যাচে তারা জিতেছে ৭-১ গোলে। ২৪ ম্যাচের মধ্যে একটি ছিল গোলশূন্য। স্পেনকে চমকে দিয়ে ওই ম্যাচটিকে গোলবিহীন রেখেছেন নবিশ কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে মাঠে নেমে হ্যাটট্রিক করেছেন লিওনেল মেসি। এমবাপ্পের ছুটে চলা আর রোনালদোর নিস্প্রভতার সঙ্গে ঘটনাবহুল ছিল প্রথম রাউন্ড। গতকাল রাতেই শুরু হয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ড। দেখে নেয়া যাক প্রথম রাউন্ডের কিছু ঘটনা।
মেসি বীরত্ব
কাতার বিশ্বকাপ যেখানে শেষ করেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে যেন সেখান থেকেই শুরু করলেন লিওনেল মেসি। সেই ক্ষিপ্রতা, বাঁ পায়ের ম্যাজিক, নিখুঁত নিশানা সবই যেন আগের মতোই আছে। কিছুই ফুরিয়ে যায়নি! ম্যাচের পঞ্চম মিনিটে তিনি প্রথম আলজেরিয়ার জালে বল জড়ান কিন্তু শরীর একটুখানি লাইনের বাইরে থাকায় অফসাইডের খাঁড়ায় পড়েন। তবে গোলের জন্য বিধাতা তাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষায় রাখেনি। ১৭ মিনিটেই গোলের দেখা পেয়েছেন এই ফুটবল ঈশ্বর। এরপর আরও দুইবার বল জালে পাঠিয়েছেন মেসি। এই তিন গোলের মাধ্যমে মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডধারী মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ডকে স্পর্শ করেছেন।
গোলহীন রোনালদো
কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্দ- দু’জনই দু’টি করে গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসির সঙ্গে এরইমধ্যে লড়াই শুরু করেছেন। যে কারণে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। যদিও ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা পর্তুগিজ তারকা প্রথম ম্যাচে নিস্প্র্রভ ছিলেন। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো পুরো ম্যাচে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেছেন, যা পর্তুগালের হয়ে কোনো বড় টুর্নামেন্টে পূর্ণ সময় খেলে তার সর্বনিম্ন স্পর্শের রেকর্ড। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারের ১,০০০ গোলের মাইলফলকের দিকে এগিয়ে চলা রোনালদো এখন বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচে গোলহীন।
নেইমারের জন্য অপেক্ষা বাড়ছে
মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে ব্রাজিল। গুরুত্বপূর্ণ ওই ম্যাচে নেইমারকে মাঠে পাননি কার্লো আনচেলোত্তি। মাঠে নামতে না পারলেও ঠিক ডাগআউটে ছিলেন এই তারকা। মরক্কোর সঙ্গে না পেলেও পরের ম্যাচে তাকে পাওয়ার আশায় ছিলেন সকলে। যতটুকু জানা যায়, অনুশীলনে নামলেও আগামীকাল হাইতি ম্যাচে তাকে খেলানোর ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না ব্রাজিলের কোচ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচেও তাকে পাওয়া যাবে কিনা তারও নিশ্চয়তা মিলছে না।
একরাতেই তারকা ভোজিনিয়া
ভোজিনিয়ার বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্সেই স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দেশকে এক পয়েন্ট এনে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি রাতারাতি সেলিব্রিটি। ম্যাচের আগে তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ছিল ৫০ হাজার। এখন তা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছেছে, যা এনএফএল তারকা প্যাট্রিক মাহোমেস এবং এনবিএ তারকা ভিক্টর ওয়েমবানিয়ামার চেয়েও বেশি।
চড়া টিকিটের দামেও দর্শকে ভরা স্টেডিয়াম
মঙ্গলবার অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের ম্যাচে লেভাইস স্টেডিয়াম প্রায় পূর্ণ দর্শকে ভরে যাওয়া প্রমাণ করেছে যে, উচ্চ টিকিট মূল্যও এই বিশ্বকাপে দর্শকদের নিরুৎসাহিত করতে পারেনি।
ফিফা জানিয়েছে, এ বছর এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সুপার বোল ম্যাচে সরকারি হিসেবে উপস্থিত দর্শকসংখ্যা ছিল ৬৮,৫২৭ জন। মঙ্গলবার মোট ২,৮১,২২৩ জন দর্শক বিভিন্ন স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন; যা একদিনে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতির নতুন রেকর্ড। এর আগে ১৯৯৪ সালের ২৮শে জুন স্থাপিত রেকর্ড ছিল ২,৭৭,০৭০ জন।
লাল কার্ড নিয়ে বাড়তি সতর্কতা
রেফারিরা লাল কার্ড দেখাতে সংযত। ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে মাত্র চারটি করে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল; যা আগের আসরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এবারের আসরে শুরুতে মনে হচ্ছিল লাল কার্ডের বন্যা বয়ে যেতে পারে। উদ্বোধনী ম্যাচে সহ-আয়োজক মেক্সিকো ১০ জন নিয়ে খেলে ৯ জনের দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারায়, আর সেই ম্যাচে তিনজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন। ওই ম্যাচের পর বাকি ২৩ ম্যাচে আর কোনো লাল কার্ড দেখা যায়নি। এমনকি ম্যাচে হলুদ কার্ডের সংখ্যাও অনেক কম দেখা যাচ্ছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্রাজিলিয়ান রেফারি উইলটন সামপাইওর ওই ম্যাচের পারফরম্যান্সের পর ফিফা রেফারিদের আরও সতর্কভাবে লাল কার্ড ব্যবহার করতে উৎসাহিত করেছে।
হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে সমালোচনা
হঠাৎ করে এবারের বিশ্বকাপে ২২ মিনিটের সময় হাইড্রেশন ব্রেক দিচ্ছেন রেফারি। এ সময় খেলা থামিয়ে ফুটবলারদের পানি পান করতে দেখা যাচ্ছে। অতিমাত্রায় গরম থাকলে এই ধরনের বিরতি দিয়ে থাকেন রেফারিরা। তবে এবার ফিফা প্রতিটি ম্যাচেই খেলার মধ্যে দুই অর্ধে এই বিরতি দিয়ে আসছেন। এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে চারদিকে। কারণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাঠেও দেয়া হচ্ছে হাইড্রেশন ব্রেক! ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে এমন অদ্ভুত কাণ্ডই ঘটিয়েছে ফিফা। ডালাসের ৭০ হাজার ৩৭৯ জন সমর্থক এর সাক্ষী হয়েছেন। আর মাঠে বসেই তার প্রতিবাদ করেছেন খেলা দেখতে আসা সমর্থকরা। গ্যালারি থেকে দুয়োধ্বনি দেন। এক ইংলিশ সমর্থক বিবিসিকে বলেন, ‘এয়ার কন্ডিশনড স্টেডিয়ামে এর কোনো প্রয়োজন নেই। এটি ফুটবলের ছন্দ নষ্ট করছে। এটি ফুটবলের ‘আমেরিকানাইজেশন’ অর্থাৎ খেলাটিকে ফুটবল থেকে ভেঙে চার কোয়ার্টারে পরিণত করা হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়।’ এর আগে নরওয়ে-ইরাক, সুইডেন-তিউনিসিয়া ও স্পেন-কেপ ভার্দে ম্যাচেও একই ধরনের প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে আয়োজকদের। সমর্থকরা মনে করছেন, বিজ্ঞাপন বিরতির জন্য এই ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ একটি কৌশল মাত্র।
ম্যাঠের খেলাতেও নানা রকম ফের হয়েছে। এই যেমন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬৭তম স্থানে থাকা কেপ ভার্দে রুখে দিয়েছে ২-এ থাকা স্পেনকে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত চারটি ম্যাচের চারটিই ড্র হয়েছে। বিশ্বকাপে এমন ঘটনা ঘটেছিল ৬৮ বছর আগে। কাকতালীয়ভাবে ১৯৫৮ সালের সেই দিনটাও ছিল ১৫ই জুন। একদিনে ড্র হয় চারটি ম্যাচ।
