চুক্তি সত্ত্বেও শঙ্কা, বদলে যেতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ

চুক্তি সত্ত্বেও শঙ্কা, বদলে যেতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান এবং দীর্ঘদিনের বৈরিতা দূর করতে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের অবসান ঘটানো কতটা জটিল হবে- সেই চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।

বুধবার (১৭ জুন) ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যে সমঝোতা স্মারক (মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষর হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুক্রবার চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। তবে তার আগেই ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনে অংশ নেয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন।
অন্যদিকে তেহরান নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এই চুক্তিতে সই করেছেন।

দেশ দুইটির মধ্যে এই সমঝোতার পর এখন ৬০ দিনের মধ্যে ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি হবে। সেই সঙ্গে পারস্পরিক সম্মতিতে সময় বাড়ানোও যাবে।
সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তুলে নেবে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু করা এবং ইরানের ওপর ‘সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা শুরু করার অঙ্গীকার রয়েছে।

পাশাপাশি সমঝোতা স্মারকে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার (৩০ হাজার কোটি) তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের পক্ষ থেকে পুনরায় অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
তবে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রাথমিক চুক্তি চূড়ান্ত নয় এবং এটি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার বোমা বর্ষণে ফিরে যেতে পারে।

অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার অবিশ্বাস রয়ে গেছে এবং ইরানের আঙুল ট্রিগারের ওপরই আছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্বারকে চুক্তি হলেও এখনও শঙ্কা রয়েছে অনেক। দেশ দুইটির মধ্যে আলোচনা বিপন্ন করে দেয়ার মতো অনেক কারণ এখনো রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এমন উল্লেখযোগ্য তিনটি কারণের কথা জানিয়েছেন।

লেবাননে ইসরাইলের অভিযান
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী- উভয়পক্ষই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। চুক্তিতে লেবাননকেও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, যাতে দেশটির ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করা হয়।
এনিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘লেবাননের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার’ কথা বলেছেন। তবে এতকিছুর পরেও ইসরাইল লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বুধবার ইসরাইলি যুদ্ধবিমান নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকা এবং পাশের কফর তেবনিতের উপকণ্ঠে হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, লেবানন যদিও যুদ্ধবিরতির কাঠামোর মধ্যে রয়েছে, তবুও লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার এই চুক্তির শর্ত নয়। তারা বলেছেন, ইসরাইল আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রাখবে।

অন্যদিকে ইরান বলেছে, লেবাননের যুদ্ধের অবসান যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও এই অবস্থান সমর্থন করেছে।
হিজবুল্লাহর জনসংযোগ দপ্তর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরান তাদের মিত্রকে আশ্বস্ত করেছে যে, আলোচনার পরবর্তী ধাপে তারা লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানাবে।
এদিকে ইসরায়েলও স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা এই চুক্তি সম্পর্কে ইরানের ব্যাখ্যায় নিজেদের বাধ্য মনে করে না।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ বলেন, ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে নিরাপত্তা অঞ্চলে ‘সময়সীমা ছাড়া’ অবস্থান করবে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, লেবানন ইস্যুতে ইরান ইসরাইলের ওপর হামলা চালালে তারা পূর্ণ শক্তি দিয়ে আঘাত হানবে।

বৃটেনের গবেষণা সংস্থা রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এইচ. এ. হেলিয়ার বলেন, শান্তি প্রচেষ্টায় তেল আভিব ‘প্রধান বাধাদানকারী’ হিসেবে কাজ করেছে।
তার মতে, ইসরাইলের সামরিক অভিযান- তা ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হোক বা লেবাননে চলমান ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে হোক, কূটনৈতিক অগ্রগতির জন্য এটা সবচেয়ে বড় একক হুমকি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
আরেকটি জটিল বিষয় হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। যদিও ট্রাম্প বলেছেন, এটি জব্দ করার কোনো তাড়াহুড়া নেই। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পর্যন্ত ইরান প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম জমা করেছিল। একটি পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির মাত্রা প্রায় ৯০ শতাংশ হয়।

তেহরান ধারাবাহিকভাবে দাবি করে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং চুক্তিতে তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
তবে বিদ্যমান সমৃদ্ধ পদার্থের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে- এটাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

উভয়পক্ষ নীতিগতভাবে জমাকৃত সমৃদ্ধ পদার্থ কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সম্মত হয়েছে। ন্যূনতমভাবে, ইউরেনিয়াম ‘ডাউনব্লেন্ড’ করা হবে, অর্থাৎ এর মান কমানো হবে এবং তা আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট স্থানেই সম্পন্ন হবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সাবেক উপপ্রধান ডারিন সেলনিক বিবিসি রেডিও ফোর-এর টুডে অনুষ্ঠানে বলেন, ইরান আবারও যদি অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে শুরু করে বলে মনে হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভবত আবার সামরিক অভিযান শুরু করবেন।

হরমুজ প্রণালি
যুদ্ধের কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে আছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যেত। বুধবার সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের এখন লক্ষ্য, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখা।
সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর জলপথটি পুনরায় খুলে দেয়া হবে। এই নৌপথের প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত বাধা, যার মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে মাইন অপসারণও রয়েছে, দূর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ৬০ দিনের জন্য প্রণালিটি পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং এর বিপরীত দিকেও টোলমুক্ত থাকবে। এতে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জলপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক পরিষেবা নিয়ে ওমানসহ অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান।

এর ফলে ভবিষ্যতে কিছু ফি আরোপের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত হতে পারে।
তেহরান ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, এই প্রণালি পরিচালনায় তারা আরও বড় ভূমিকা চায়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে তারা সেবা ফি নেবে। তবে এসব ফি কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবে তা স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যাতায়াতের জন্য টোল নেয়া অনুমোদিত নয়, যদিও নির্দিষ্ট কিছু সেবার জন্য চার্জ নেয়া যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনার পর প্রণালিটি টোলমুক্তই থাকবে বলে তারা আত্মবিশ্বাসী।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি বিবিসি’কে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির মাইন অপসারণে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
সংকট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপ–এর মার্টিন কেলি বিবিসি ভেরিফাই’কে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে হলে অত্যন্ত সাহসী কোনো অধিনায়ক লাগবে।
হেলিয়ার সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার এই চুক্তিটি এখনো কেবল ‘একটি সমঝোতা স্মারক- আলোচনার কাঠামো, কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কঠিন কাজ এখনো শুরুই হয়নি।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন