২০১৫ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় দায়ের হওয়া একটি নাশকতার মামলার দুই আসামি কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদারের কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ও বর্তমানে ভোলার চরফ্যাশন আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টর মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিনি এ জবানবন্দি দেন। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেলে নজরুল ইসলামের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এ মামলায় মোট আসামি ৪জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন। পলাতকরা হলেন- বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহ।
ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহর নির্দেশে দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পরে তাদের ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে বৈধতা দিতে জিডি ও মামলার এজাহারে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ২০১৫ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া-কোটালীপাড়া সড়কের বুধার এলাকায় একটি ফলবাহী পিকআপে আগুন দেওয়ার ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের হয়। মামলার তদন্তভার পান তৎকালীন এসআই নজরুল ইসলাম। তদন্ত চলাকালে আসামি গ্রেপ্তারে বিলম্ব হওয়ায় তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ তাকে ও আগৈলঝাড়া থানার ওসিকে তলব করেন এবং আসামি গ্রেপ্তারের জন্য চাপ দেন। তিনি বলেন, পুলিশ সুপারের নির্দেশে বরিশাল জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই খলিলুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় যান। পরে ডিবি, ডিএমপির সহযোগিতায় ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে আশুলিয়া থেকে কবির মোল্লা এবং কেরানীগঞ্জ থেকে টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, গ্রেপ্তারের পর দুই আসামিকে আগৈলঝাড়া থানায় না এনে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ভূরঘাটা এলাকায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দলের কাছে হস্তান্তর করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তিনি আসামিদের হস্তান্তর করেন। এরপর ওই রাতেই আগৈলঝাড়া থানার সব পুলিশ সদস্যকে বুধার বাইপাস এলাকায় অবস্থান নিতে বলা হয়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শোনার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদারের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, থানার কোনো কর্মকর্তা ‘ক্রসফায়ার’ দিতে রাজি না হওয়ায় অন্য থানা থেকে সদস্য এনে কাজটি করানো হয়েছে।
নজরুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর পুলিশ সুপারের নির্দেশে থানায় বসেই জিডি ও দুটি মামলার এজাহার প্রস্তুত করা হয়। চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে তাকে জোরপূর্বক জিডি ও এজাহারে স্বাক্ষর করানো হয়। অসুস্থতার কথা জানিয়ে আপত্তি করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, পরবর্তীতে পিকআপে অগ্নিসংযোগ মামলার তদন্ত শেষ করে নিহত দুই ব্যক্তিকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে বাধ্য হন। তার ভাষ্য, সে সময় দেশে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিচারবহির্ভূত হত্যার যে প্রবণতা ছিল, আগৈলঝাড়ার ঘটনাও তারই অংশ।
