মৌলভীবাজারের কর্মসূচিতে অংশ নিতে বুধবার সকালে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ঢাকা থেকে সিলেটে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখান থেকে সড়ক পথে যান মৌলভীবাজার। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান স্থানীয় বিএনপি নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সময় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন আপনারা এখানে কেন? আজকে আপনাদের
সংসদ নেই? সংসদে যান। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা পেয়ে সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বিকালে ঢাকায় ফিরে সংসদ অধিবেশনে অংশ নেন। অবশ্য সিলেট বিমানবন্দরে উপস্থিত অন্য এমপিদের আর কাউকে গতকালের অধিবেশনে দেখা যায়নি।
ওদিকে প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজারে পৌঁছে পৃথক কর্মসূচিতে অংশ নেন। প্রথমে শ্রীমঙ্গলে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতে তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে আমরা দেখেছি, কীভাবে জনগণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছিল। একটি দল জনগণের টাকা জনগণকে না দিয়ে দেশ থেকে বিদেশে পাচার করেছিল। দেশের টাকা, জনগণের টাকা আর পাচার হতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, দেশের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করা হবে। দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য টাকার কোনো অভাব হবে না। যারা এই দেশ থেকে টাকা পাচার করেছে তাদের ছাড় দেয়া হবে না। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, এদেশ থেকে জনগণের টাকা আর পাচার হতে দেয়া হবে না। দুপুর ১টার দিকে শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল মাঠে ও দুপুর আড়াইটার দিকে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উপকারভোগীদের মাঝে তৃতীয় ধাপের ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই। বর্তমান সরকারের একটাই কাজ, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। বাংলাদেশের ভাগ্যের পরিবর্তন। এজন্য দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমিকের হাতে রূপান্তরিত করতে হবে। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই ভাইয়েরা-আপনারা কি চান? বিএনপি যে কাজগুলো করছে, এই কাজগুলো আগামী ৫ বছর অব্যাহত থাকুক?’ আপনারা কি চান দেশের সকল মায়ের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের কাছে কৃষি কার্ড পৌঁছে দেই? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দেই। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করি।
এ সময় উপস্থিত জনতা হাত তুলে সমস্বরে সমর্থন জানান। প্রধানমন্ত্রী জনতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা সংসদে বাজেটে ন্যূনতম স্বাস্থ্য সুবিধার জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে স্কুল-কলেজে ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারে, খেলাধুলা করতে পারে- তার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অনেকে বলেছে, সেই বাজেট না-কি তারা মানে না। বাজেটে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছি। কৃষকদের জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছি। মায়েদের ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বরাদ্দ রেখেছি। স্বাস্থ্য সুবিধার জন্য, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী মানুষর জন্য অর্থবরাদ্দ রেখেছি। সেই বাজেট না-কি চানাচুরের মতো। তিনি বলেন, এই বাজেট জনগণের বাজেট। যে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই সেই বাজেটকে তারা গণবিরোধী বাজেট বলে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই যে আমরা মায়েদের ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছি, ৬০টি নিত্যপণ্যের উপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহার করে নিয়েছি। তারা এর বিরোধিতা করলে আমরা তা কন্টিনিউ করতে পারবো না।
তিনি বলেন, দেশের কোটি কোটি গরিব মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের সকল ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। ৪০ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেয়া হবে। ২২ লাখ শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা সারা দেশে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। আগামীতে আমরা এই ধারা অব্যাহত রেখে তাদের মেধার মূল্যালয়ন করতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে ৪ কোটি পরিবার রয়েছে। আমরা বলেছিলাম বিএনপি ১২ তারিখের নির্বাচনে সরকার গঠন করলে পর্যায়ক্রমে সকল পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেবো। বিশেষ করে নারী পরিবারের প্রধানদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে। আমরা নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি।
ইতিমধ্যে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, মন্দির-গির্জার ধর্মীয় প্রধান, পুরোহিতদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করা হয়েছে। আগামী বছর প্রতি উপজেলায় ৮ হাজার জনকে এই সম্মানী দেয়া হবে। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে শিল্পকারখানাসহ নানা কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের মানুষ শান্তি চায়। স্থিতিশীলতা, দরিদ্রতা ও বেকারত্বের অবস্থান থেকে মুক্তি চায়। কাক্সিক্ষত উন্নয়ন চায়। গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা চায়। এমন চাওয়া বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিএনপি জনগণের দল। বিএনপি’র শক্তির উৎস হলো জনগণ। জনগণ আমাদের সঙ্গে থাকলে অপপ্রচারকারী-ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হতে পারবে না। আমরা যেকোনো মূল্যে আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবো-ইনশাআল্লাহ।
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বক্তব্য রাখার আগে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে প্রধানমন্ত্রী বাটন চেপে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সদস্যদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন এবং একইসঙ্গে ২০টি জেলার তৃতীয় পর্যায়ে ৯০৮২ জন উপকারভোগীর মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন। এ সময় অন্যান্য ১৯টি জেলার উপকারভোগীরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত প্রতি জনে ৫০ হাজার, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নৃ-জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে ১০ হাজার করে, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নৃ-জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের প্রতি জনে ১০ হাজার, চা শ্রমিকদের টেকসই আবাসন নির্মাণে প্রতি জনে ২ লাখ করে এবং দুঃস্থ অসহায়, প্রতিবন্ধী ও গৃহহীন বিশেষ অনুদানের আওতায় প্রতি জনে ১০ হাজার টাকার চেক বিতরণ করেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সঞ্চালনায় ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেনÑ প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংসদ সদস্য ও হুইপ আলহাজ জিকে গউছ, সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু, নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু, সংসদ সদস্য জহরত আদিবা চৌধুরী, প্রধানন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহিদুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান মিজান, জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন, সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা, শাম্মী আক্তার, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকী, সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি ও সিলেট সিটির প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ। প্রবল বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও দু’টি স্থানে প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে ও তাকে বরণ করতে হাজার হাজার জনতার উপিস্থিত ছিল লক্ষণীয়। সিলেট থেকে সড়ক পথে মৌলভীবাজার আসার সময় রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীও তাদের সালাম ও অভিবাদনকে হাত নেড়ে স্বাগত জানান।
চণ্ডিছড়া চা বাগানে ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন: স্বাবলম্বী পরিবার গঠনের লক্ষ্যে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চণ্ডিছড়া চা বাগানে সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বুধবার বিকালে চণ্ডিছড়া খেলার মাঠে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর-চুনারুঘাট) আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ মো. ফয়সল, হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ, চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী, উপজেলা বিএনপি সভাপতি মনিরুল ইসলাম, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ লিয়াকত হাসান, সাবেক পৌর মেয়র নাজিম উদ্দিন শামসুসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং চা বাগানের হাজারো নারী-পুরুষ।
