ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির খসড়া সামনে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হাতে আসা নথি অনুযায়ী,দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা কাঠামোতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া, ইরানের জন্য কিছু অর্থনৈতিক শিথিলতা এবং তেহরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১৪ দফার সমঝোতা স্মারকটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সিএনএন জানিয়েছে, নথিটির একটি কপি তারা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে নথিটি দেখেছেন এমন এক কূটনীতিক এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুইজন কূটনৈতিক সূত্রও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন।
খসড়া অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তার তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রির অনুমতি দেবে। পাশাপাশি, পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করলে ইরান ধাপে ধাপে প্রস্তাবিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। তবে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হবে, সে বিষয়ে নথিটিতে কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরণ অন্তর্ভুক্ত নেই।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, গত রোববার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ডিজিটালভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা
১। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এবং বর্তমান সংঘাতে সংশ্লিষ্ট তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করবে। উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আক্রমণ, শত্রুতামূলক পদক্ষেপ বা শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
২। উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
৩। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালাবে; পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে।
৪। চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র নৌ- অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের বাণিজ্যিক নৌ-চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করতে বাধা প্রদান বন্ধ করবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে নৌপথ সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
৫। একই সঙ্গে ইরানও পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এবং প্রযুক্তিগত বাধা ও মাইন অপসারণসহ সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করবে।
৬। যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য দুই পক্ষের সম্মতিতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করবে, যার আওতায় অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকবে। এর বাস্তবায়ন কাঠামো ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করা হবে।
৭। যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেবে, যার মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮। ইরান পুনর্ব্যক্ত করবে যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামসহ অন্যান্য পারমাণবিক বিষয় ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
৯। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখবে- ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে না।
১০। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরানি তেল, পেট্রোকেমিক্যাল ও সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন অনুমোদন প্রদান করবে।
১১। ইরানের স্থগিত বা জব্দকৃত অর্থ ও সম্পদ মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে এবং তা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে।
১২। সমঝোতা স্মারক ও পরবর্তী চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য দুই পক্ষের অংশগ্রহণে একটি যৌথ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া গঠন করা হবে।
১৩। এই সমঝোতা স্মারকের ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর এবং সেগুলোর কার্যকারিতা বজায় থাকলে দুই দেশ চূড়ান্ত চুক্তির অবশিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে।
১৪। চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
