ক্যারিয়ারে কতোকিছুই না অর্জন করেছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ, কোপা, ব্যালন ডি’অরসহ আরও কতোশত অর্জন। এর পরেও কিছু একটার অপূর্ণতা ছিল এই আর্জেন্টাইন তারকার। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে সেই পূর্ণতা পেলো, বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিকের মধ্যদিয়ে। এতদিন যৌথভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ হ্যাটট্রিকের মালিক ছিলেন মেসি-রোনালদো (১০টি)। তবে ১১ হ্যাটট্রিক নিয়ে এখন এককভাবে এই কৃতিত্বের মালিক মেসি। এদিকে, আরও দুটি বিশ্বরেকর্ড গড়ার সামনে মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল করেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে গেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তার মতো ১৬ গোল আছে মিরোসøাভ ক্লোসারও। পরের লক্ষ্য রেকর্ডটা নিজের করে নেয়া।
কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের জয় ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্ব এখন বুঁদ কেবল একটি নামেই-লিওনেল মেসি। ঠিক ২০ বছর আগে, ২০০৬ সালের এই ১৬ই জুনে (স্থানীয় সময়) সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করেন দীর্ঘকেশী এক তরুণ। দুই দশক পর, সেই একই দিনে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে খাতা খোলা মেসি বনে গেলেন দলটির ইতিহাসের বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতাও। সময়ের আবর্তে গতি কিছুটা কমলেও, তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আর শূন্যস্থান খুঁজে নেয়ার ক্ষমতা যে এখনো কতোটা নিখুঁত, তা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগ। ম্যাচ শেষে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’-এর ট্রফি হাতে স্বভাবসুলভ বিনয়ী মেসি ব্যক্তিগত এই অর্জনকে কিছুটা আড়াল করতেই চাইলেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, রেকর্ডটি আমার কাছে মুখ্য নয়। ক্লোসা কিংবা রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের পাশে থাকাটা অবশ্যই সম্মানের। কিলিয়ান এমবাপ্পেও এদিনও দুটি গোল করেছেন। দিনশেষে এগুলো কেবলই পরিসংখ্যান, এর বেশি কিছু নয়। তবে মেসি মুখে যা-ই বলুন না কেন, তার তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সতীর্থদের অজানা নয়। যদিও প্রিয় বন্ধু রদ্রিগো ডি পল হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি কসম খেয়ে বলছি, ও এসবের (রেকর্ডের) কোনো তোয়াক্কাই করে না। মাঝেমাঝে আমরা যখন একসঙ্গে বসে মাতে (আর্জেন্টাইন চা) খাই, তখন ওকে বলি-‘বন্ধু, তুমি আর মাত্র এক বা দুই গোল দূরে আছো।’ ও সত্যি অবাক হয়ে তাকায়, যেন কিছুই জানে না!’ বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক তুলে নিয়ে ম্যাচের ৮০তম মিনিটে যখন মেসি মাঠ ছাড়ছেন, তখন ৭০ হাজার দর্শকের করতালিতে মুখরিত স্টেডিয়াম। কোচ লিওনেল স্কালোনির আবেগপ্রবণতার কথা তো আর অজানা নয় কারও। এই রাতেও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। কেঁদেই ফেললেন। ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে স্কালোনি বলেন, ‘আমার কোনো ভাষা নেই, যা-ই বলবো তা-ই কম হয়ে যাবে। গত ২০ বছর ধরে ও এটিই করে আসছে।’ মেসির লড়াকু মানসিকতা নিয়ে স্কালোনি আরও বলেন, ‘সে মাঠের একটা বলের আশাও সহজে ছাড়ে না। এটিই আমাদের খেলার ধরন। জয় ছাড়াও মেসির লড়াকু মানসিকতা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’ ডি পলের ভাষায়, ‘ও একটা দানব। সবচেয়ে বড় কথা, ও এখন চাপমুক্ত হয়ে খেলাটা উপভোগ করছে এবং ওর এই আনন্দ পুরো দলের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে।’ এতসব কিছুর পরেও মেসিও একজন মানুষ। তারও ভালো মন্দ দিন যেতে পারে। যেমন গেছে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ। তখন তিনি ক্যারিয়ারের সেরা ছন্দে। বয়স মাত্র ২৩ বছর। বার্সেলোনার হয়ে করে চলেছেন একের পর এক কীর্তি। ২০০৯-১০ মৌসুমে লা লিগায় করেছেন ৩৫ ম্যাচে ৩৪ গোল। জিতেছিলেন লা লিগাও। অথচ বিশ্বকাপে এর প্রতিফলন নেই। বিস্ময়করভাবে সেই বিশ্বকাপে একটা গোলও করতে পারেননি মেসি। এমনকি ছিল না একটা অ্যাসিস্টও। ডিয়েগো ম্যারাডোনা তখন ছিলেন আর্জেন্টিনার কোচ।
ম্যারাডোনা-মেসির জাদুকরী ছোঁয়ায় আর্জেন্টাইনরা স্বপ্ন দেখছিল বিশ্বকাপ শিরোপার। কিন্তু মেসি নিষ্প্রভতায় আর্জেন্টিনা বাদ পড়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে। এই বিশ্বকাপটা ছাড়া ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে মেসি বরাবরই সফল। ২০০৬ বিশ্বকাপে করেছিলেন ১ গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট। ২০১৪ বিশ্বকাপে ৪ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট। ২০১৮ বিশ্বকাপে তার গোল ১টি আর অ্যাসিস্ট ২টি। আর ২০২২ বিশ্বকাপে তো ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের নায়কই তিনি। এমনকি এবারের বিশ্বকাপটাও শুরু করলেন ৩ গোল করে। এই ফুটবল জাদুকরের খেলা দেখে মনে হচ্ছে, কিংবদন্তির বয়স বাড়ে কিন্তু তার জাদু কখনো শেষ হয় না। বিদায় বেলায় তাইতো পায়ের জাদুতে নতুন গান লিখে যাচ্ছেন তিনি।
