জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ডানপন্থী ইসরাইলি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ মোশে ফেইগলিন সম্প্রতি ওই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে প্রার্থনা ও ২০ জন ইহুদি মিলে ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনের পর এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা নতুন করে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
ফেইগলিন বলেন, ইসরাইলের পুরো ভূমি ঈশ্বরের সন্তানদের জন্য প্রতিশ্রুত এবং এখানেই আমরা সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি নতুন ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ করব, যেখানে সবাই একসঙ্গে প্রার্থনা করতে পারবে।
তাদের দাবি, তারা একই স্থানে একটি বৃহৎ নতুন ইহুদি টেম্পল নির্মাণ করতে চান- যে স্থানটি গত প্রায় ১৪শ বছর ধরে ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, অর্থাৎ আল-আকসা প্রাঙ্গণ।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেইগলিন খোলামেলা ও স্পষ্টভাবে কথা বলছিলেন যেন তার যুক্তিটি বিতর্কিত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না।
কিন্তু তিনি যা বলছিলেন এবং করছিলেন তা একটি সংবেদনশীল চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী, যে চুক্তিটি পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র ও আবেগঘন একটি স্থানে শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে প্রণীত।
ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থান আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ, যা মুসলমানদের কাছে ‘আল-হারাম আল-শরিফ’ এবং ইহুদিদের কাছে ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত। এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান।
জেরুজালেমের ৩৫ একর বিস্তৃত আল-আকসা প্রাঙ্গণে স্বর্ণখচিত গম্বুজবিশিষ্ট ‘ডোম অব দ্য রক’ দূর থেকেই চোখে পড়ে এবং পুরো এলাকাকে আধিপত্য করে আছে। এই স্থাপনাটি ইসলামি ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পবিত্র কোরআনে আল-আকসার উল্লেখ রয়েছে এবং মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী এখান থেকেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মেরাজে গমন করেছিলেন।
স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে মুসলমানদের একমাত্র প্রার্থনার জন্য সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহ্যবাহী অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে কি না- সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
‘স্থিতাবস্থা’ নামে পরিচিত কয়েক দশক পুরোনো একটি বোঝাপড়া অনুসারে, আল-আকসা প্রাঙ্গণের প্রশাসনিক দায়িত্ব জর্ডান পরিচালিত ইসলামিক ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে। সেখানে অমুসলিমদের প্রবেশের অনুমতি থাকলেও তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা প্রার্থনা করার নিয়ম নেই।
সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরাইলি ও মার্কিন কর্তৃপক্ষ আল-আকসার স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিছু সূত্র জানিয়েছে, ইসরাইল সরকার একটি নতুন কাঠামো তৈরি করছে, যার মাধ্যমে আল-আকসা প্রাঙ্গণকে ‘মাল্টি-ফেইথ সেন্টার’ হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে।
এমন পরিবর্তন হলে সেখানে ইহুদিদের ধর্মীয় প্রার্থনা বাড়তে পারে এবং ধীরে ধীরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতে চলে যেতে পারে । তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এ ধরনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।
অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় বারবার দাবি করেছে, ‘স্থিতাবস্থা’তে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে জর্ডান, মিসর এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে আল-আকসার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্য বলেছে, জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।
ইসরাইলের ডানপন্থী রাজনীতিক ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরসহ কয়েকজন নেতা আল-আকসায় ইহুদিদের প্রার্থনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সম্প্রতি জেরুজালেম দিবস উপলক্ষে একটি ভিডিওতে ইতামার বলেন, টেম্পল মাউন্ট আমাদের, এটি আমাদের হাতে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলি পতাকা উত্তোলন এবং ধর্মীয় গান পরিবেশনের ঘটনাতেও অংশ নেন, যা স্থিতাবস্থা চুক্তির পরিপন্থী বলে সমালোচিত হয়েছে।
