‘ওসি মশিউর বললেন, ‘সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার’। সঙ্গে সঙ্গে একটি বিকট শব্দ হয়। আমার বন্ধু রুহুল আমিন ‘মাগো’ বলে চিৎকার করে ওঠে। তখন আমি বুঝতে পারি তাকে গুলি করা হয়েছে।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া সাক্ষ্যে এমনই ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন যশোরের মো. ইসরাফিল হোসেন। তার দাবি, ২০১৬ সালে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাকে ও তার বন্ধু রুহুল আমিনকে গুলি করে পঙ্গু করা হয়। যশোরের চৌগাছায় গ্রেপ্তারের পর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলির ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ ৮ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এদিন, ইসরাফিলকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তাকে পরবর্তী জেরা ও মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৫শে জুন দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
জবানবন্দিতে ইসরাফিল বলেন, ২০১৬ সালের ৪ঠা আগস্ট রাতে ডিবি কার্যালয় থেকে চৌগাছার দিকে নেয়ার সময় তাদের হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। পরে বন্দলীতলা মাঠের পাশে তোতা মিয়ার বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সেখানে প্রথমে তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান এবং কেউ একজন ‘ফায়ার অফ’ বলার কথা শুনে কণ্ঠস্বর থেকে বুঝতে পারেন সেটি ওসি মশিউরের। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তখন ধারণা করেছিলেন হয়তো তাদের আর গুলি করা হবে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ওসি মশিউর রহমান ‘সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার’ বলে নির্দেশ দেন। নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দ হয় এবং তার বন্ধু রুহুল আমিন ‘মাগো’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। সেই মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারেন রুহুলকে গুলি করা হয়েছে।
ইসরাফিল আরও বলেন, অল্প সময় পর তিনি নিজের বাম হাঁটুতে বন্দুকের স্পর্শ অনুভব করেন এবং পরক্ষণেই গুলিবিদ্ধ হন। গুলির আঘাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে পুলিশ তার হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে ক্ষতস্থানে ধুলাবালি লাগিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়। চোখ খুলে তিনি দেখেন, পাশে রুহুল আমিনও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন। সাক্ষ্যে তিনি দাবি করেন, ঘটনাস্থলে ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল সাজ্জাদ ও কনস্টেবল জহুরুলসহ পুলিশের একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ এবং সেখান থেকে যশোর সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। পরবর্তীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাম পা হাঁটুর উপর থেকে কেটে ফেলতে হয়। জবানবন্দির শেষাংশে ইসরাফিল হোসেন পুরো ঘটনার জন্য তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল সাজ্জাদ ও কনস্টেবল জহুরুল হকের বিচার ও শাস্তি দাবি করেন।
