বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে। ২২ লাখেরও বেশি ক্ষুদে ফুটবলারের অংশগ্রহণ করছে এই টুর্নামেন্টে। হয়েছে এক লাখেরও বেশি ম্যাচ। যা এই টুর্নামেন্টকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্কুলভিত্তিক ক্রীড়া আয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই প্রতিযোগিতা।
বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে এ বছরের টুর্নামেন্টে অংশ নেয় বালক ও বালিকা মিলিয়ে ২২ লাখ ১৪ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। বালক বিভাগে ৬৫ হাজার ৩৪২টি দল থেকে ১১ লাখ ১০ হাজার ৮১৪ জন এবং বালিকা বিভাগে ৬৫ হাজার ৩২১টি দল থেকে ১১ লাখ ৩ হাজার ২৯১ জন খেলোয়াড় মাঠে নামে। গত কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে এই ফুটবল টুর্নামেন্ট। কিন্তু এতে অংশগ্রহণ এতো ব্যাপক ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আকারে এই টুর্নামেন্ট ছড়িয়ে পরে। ২০১০ সাল থেকে (পাইলট ও প্রাথমিক পর্যায়) এই টুর্নামেন্ট শুরু হয়। এরপর ২০১১-২০১৩ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিতভাবে ব্যাপক আকারে শুরু হয়।
তথ্যানুযায়ী, চীনে জাতীয় পর্যায়ের স্কুল ফুটবল কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রদেশে আলাদা আলাদা টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়। যাতে দশ থেকে পনেরো লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তবে এটি একক কোনো টুর্নামেন্ট নয় বরং একাধিক কর্মসূচির সমষ্টি। ভারতে সুব্রত কাপসহ বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক স্কুল ফুটবল লীগে প্রতি মৌসুমে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে, তবে একক আসরের হিসাবে এর পরিসর বাংলাদেশের তুলনায় কম। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলো যেমন যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে স্কুল পর্যায়ের ফুটবল মূলত আঞ্চলিক ও বিভক্ত লীগ আকারে পরিচালিত হয়। যেখানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দশ হাজার থেকে কয়েক লাখের মধ্যে সীমিত থাকে এবং সেখানে একক জাতীয় পর্যায়ের বৃহৎ গণঅংশগ্রহণমূলক টুর্নামেন্টের প্রচলন তুলনামূলকভাবে কম।
গত ৬ই এপ্রিল ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতা ধাপে ধাপে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। প্রায় দুই মাসব্যাপী এই আয়োজন দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল পর্যন্ত এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে। অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা যায়। জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয় ৪ঠা জুন মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন।
জাতীয় পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের চ্যাম্পিয়ন ১৬টি দল (৮টি বালক ও ৮টি বালিকা দল) শিরোপার লড়াইয়ে অংশ নেয়। প্রতিটি দল দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজ নিজ অঞ্চলের সেরা হয়ে এই পর্যায়ে এসেছে। আগামী ২০শে জুন ঢাকার বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিযোগিতার ফাইনাল ম্যাচ ও সমাপনী অনুষ্ঠান। সেখানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এতে অংশগ্রহণ করবে বালক বিভাগে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরিশালের বাকেরগঞ্জের দাড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বালিকা বিভাগে ময়মনসিংহের নান্দাইলের আচারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাবনার সাঁথিয়ার জোড়গাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের মতে, এই টুর্নামেন্ট শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং তাদের মধ্যে দলগত চেতনা ও নেতৃত্বের গুণ তৈরি করছে। তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজন করা হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও প্রতিভাবান ফুটবলার পাবে। যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।
আশিকুর রহমানের ছেলে এ বছর টুর্নামেন্টে খেলেছে। তিনি বলেন, আমি খুব আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম এই সময় মোবাইল আসক্তি একদম কমে গেছে। ওর মা প্রতিদিন এক গ্লাস করে দুধ দেয় সেটা খেতে চায় না। খেলার সময় দেখলাম সে নিজে থেকে দুধ চেয়ে নিয়ে খাচ্ছে।
সাফজয়ী নারী দলের কোচ ও সাবেক জাতীয় দলের ফুটবলার গোলাম রব্বানী ছোটন বলেন, এটার মূল ইতিবাচক দিক হচ্ছে অংশগ্রহণ। ছোট ছোট বাচ্চারা যে পরিমাণ উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে অংশগ্রহণ করে তা অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশে ফুটবলার তৈরিতে এটা বড় একটা প্লাটফর্ম। মারিয়া মান্ডা, সানজিদা আক্তার, তহুরা খাতুন, শ্রী মতি তৃষ্ণা রানীর মতো ফুটবলার উঠে এসেছে। নারী ফুটবলার তৈরিতে এই টুর্নামেন্ট একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে।
