চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা আর নাটকীয়তার প্রভাব পড়েছে মাঠের ফুটবলেও। ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে রোমাঞ্চকর ড্র করলেও, মাঠের বাইরের বৈরী আচরণে বিপর্যস্ত ইরান ফুটবল দল। ম্যাচ শেষ হতে না হতেই দলটিকে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়। ফলে ম্যাচ পরবর্তী ন্যূনতম শারীরিক রিকভারির সুযোগ না পেয়েই মেক্সিকোর টিজুয়ানা ক্যাম্পে ফিরে যেতে বাধ্য হয় ‘টিম মেল্লি’।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ইরানের প্রধান কোচ আমির ঘালেনোই দোভাষীর মাধ্যমে বলেন, “আজকের ম্যাচের পর তারা আমাদের বলেছে, ‘আপনাদের এখনই চলে যেতে হবে।’ খেলোয়াড়দের রিকভারির জন্য আমাদের সময়ের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমাদের বিমানে উঠে টিজুয়ানার ক্যাম্পে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য সত্যিই অনেক চ্যালেঞ্জিং।” কে বা কারা এই নির্দেশ দিয়েছে তা স্পষ্ট না করলেও ঘালেনোই বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা জানি না কেন আমাদের ফেরত পাঠানো হলো। এটি অত্যন্ত অদ্ভুত। মনে হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনা অন্য কেউ তৈরি করছে, আমাদের হয়ে অন্য কোথাও সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে ইরানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত ছিল। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সরিয়ে নেয়ার জন্য ইরানের আবেদন ফিফা আগেই প্রত্যাখ্যান করে। তার ওপর মার্কিন ভিসা জটিলতায় ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতিসহ কারিগরি ও মিডিয়া স্টাফদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আসার অনুমতি পাননি। দলের অধিনায়ক ও তারকা স্ট্রাইকার মেহেদি তারেমি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের এখনই লস অ্যানজেলেস ছাড়তে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়। আমার মনে হয় ফিফার আমাদের আরও অনেক বেশি সাহায্য করা উচিত ছিল।
আসলে, আমাদের কাছে এখন সবকিছুই একটা বিপর্যয় বলে মনে হচ্ছে।’ তারেমি আরও জানান, কড়া নিরাপত্তা তল্লাশির কারণে টিজুয়ানা থেকে লস অ্যানজেলেসের স্বাভাবিক স্বল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেই তাদের প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় লেগেছে। ভিসা জটিলতায় ম্যাচ শুরুর মাত্র একদিন আগে ভেন্যুতে পৌঁছানো এবং চরম ভ্রমণক্লান্তির কারণে ম্যাচের সময়েও ভুগতে হয়েছে ইরানি ফুটবলারদের। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬৫ ধাপ পিছিয়ে থাকা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও ২-২ গোলে ড্র করে তারা।
ক্রিস উডের পাস থেকে এলিজাহ জাস্টের জোড়া গোলে দু’বার এগিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একে তো ইরানের ঘরোয়া লীগ বন্ধ। ম্যাচ ফিটনেস ঘাটতিতে থাকা সত্ত্বেও অসাধারণ লড়াই উপহার দেয় ইরানিরা। রামিন রেজায়িয়ান ও মোহাম্মদ মোহেব্বির দুর্দান্ত গোলে দু’বার সমতায় ফেরে তারা। দলের ফুটবলারদের মাঠে ক্র্যাম্পে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে ইরান কোচ বলেন, ‘ভ্রমণের কারণে মানিয়ে নেয়ার মতো কোনো সময় আমরা পাইনি। আমাদের অনেক খেলোয়াড়ের ক্র্যাম্প হচ্ছিল।
আমরা টেকনিক্যাল কারণে নয়, বরং খেলোয়াড়দের চোট ও ক্র্যাম্পের কারণে বাধ্য হয়ে পরিবর্তন এনেছি।’ তবে মাঠের বাইরের এই প্রতিকূলতার মাঝেও, লস অ্যানজেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত ৭০ হাজারেরও বেশি প্রবাসীর অভূতপূর্ব সমর্থন উদীপ্ত করেছে দলকে। ম্যাচের পর আবেগ আপ্লুত তারেমি বলেন, ‘৯০ মিনিট জুড়েই গ্যালারিতে অবিশ্বাস্য এক পরিবেশ ছিল। আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা নিজেদের হোম গ্রাউন্ডেই খেলছি।’ আগামী রোববার গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার আগে এই বৈষম্যমূলক আচরণ ইরান দলকে মানসিকভাবে ভালোই পোড়ানোর কথা।
