ইন্টারপোলের জালে বেনজীর

ইন্টারপোলের জালে বেনজীর

ফন্ট সাইজ:

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন কোনো কাজ নেই যা তিনি করেননি। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জমি দখল, অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়া বেনজীরের কীর্তিকলাপের মধ্যে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি নেয়ার ঘটনাও রয়েছে। নিজের সব কুকীর্তি সামনে আসতে শুরু করায় কৌশলে দেশ 
ছেড়েছিলেন ২০২৪ সালের ৪ঠা মে। দুর্নীতির মামলায় তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দিয়েছিল আদালত। ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে পাকড়াও করেছে দুবাই পুলিশ। ১২ই জুন মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বেনজীরকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অবহিত করেছে ইন্টারপোল।

পুলিশের সূত্র বলছে, দুবাইতে বিমানের ট্রানজিটের সময় এআই ক্যামেরায় ধরা পড়েন বেনজীর। লন্ডন থেকে এশিয়ার একটি দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময় দুবাইয়ের ট্রানজিটে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওইদিন লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল বেনজীরের। সে অনুযায়ী, নির্ধারিত ফ্লাইটে অন্যদের সঙ্গে তিনিও দুবাই বিমানবন্দরে নামেন। এ সময় বিমানবন্দরের এআই ক্যামেরা তার চেহারা স্ক্যান করে দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল শাখায় নোটিশ করে। পরে তারা এসে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। এখান থেকে কী প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরানো হবে সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে। আইনি পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সংসদে বলেছেন, ইন্টারপোলের মাধ্যমে দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে আনা হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য নিয়োজিত পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো এনসিবি ঢাকা কর্তৃক ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়।

মন্ত্রী জানান, গত ১২ই জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরিয়েট জেনারেল অফ ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো এনসিবি আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক আছেন। এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে যে ইউএই ফেডারেল ল নম্বর ৩৯ অফ ২০২৬ অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ পেতে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সটেডিশন রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪০৮, ৪৭১ এবং ০১৯ সেকশন এবং ১৯৭৪ এর দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ এর ১১ ধারার সেকশন ১১ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। উক্ত বিষয়ে এনসিবি ঢাকা ইন্টার চ্যানেলের মাধ্যমে রেড নোটিশ প্রকাশ আন্তর্জাতিক সমন্বয় বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গ্রেপ্তার পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

দুদক কর্তৃক প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্তসংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ট্রেডিশন প্রপোজাল প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের নিকট কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট প্রেরণ করে এনসিবি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতা সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালী হোক না কেন আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
যে প্রক্রিয়ায় ফেরানো হবে: পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দণ্ডিত আসামি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চুক্তি আছে বাংলাদেশের। এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের অপরাধী কাউকে দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করলে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনা যায়। বাংলাদেশের বন্দি প্রত্যর্পণ আইনে কীভাবে বাংলাদেশের সরকার আবেদন করে আসামি বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধি অথবা ওই রাষ্ট্রে নিয়োজিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধির মাধ্যমে অপরাধীদের ফেরাতে বাংলাদেশ আবেদন করতে পারে

এ ছাড়াও সরকার এবং চুক্তিভুক্ত রাষ্ট্রের সরকারের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত অন্য কোনো পদ্ধতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্মতিতে নির্দিষ্ট যেকোনো ব্যবস্থায় অপরাধীদের ফেরাতে পারে বাংলাদেশ। ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে শুধু বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে, আমিরাতের সঙ্গে আছে দণ্ডিত বন্দি বিনিময় চুক্তি। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল দুবাই যাবে। গিয়ে আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনবে।

বেনজীরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ: রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। এই ঘটনার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ই মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে র?্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। দুদক ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের কর্মকর্তারা বলেন, ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণের পর কোথাও বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি। এই টাকা তুলে নেয়ার পর পরই তিনি বিদেশ চলে যান। নিজের এলাকা গোপালগঞ্জের বিশাল এলাকা জুড়ে রিসোর্ট গড়ে তুলেছিলেন বেনজীর।

নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েকশ’ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারা বলছেন, জমি বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। ভয় দেখিয়ে, জোর করে এবং নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমিগুলো কেনা হয়। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির উপর তিনি গড়ে তোলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। পরে আদালত পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা জব্দের নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের জুনেই সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডেমরা-ইছাপুরা সড়কের পাশে ২৪ কাঠা জায়গা জুড়ে একটি বাড়ি করেন বেনজীর আহমেদ। নিজের মেয়ের মালিকানাধীন বাড়িটির নাম দেওয়া হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড। এর আগে আনন্দ হাউজিং সোসাইটির নামে স্থানীয় প্রেমানন্দ সরকারের মালিকানাধীন একটি ৫৫ শতাংশের জলাশয় জোর করে ভরাট করা হয়। পরে ভরাট করা ওই জমি ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কিনে নেন বেনজীর আহমেদ। আইজিপি হয়ে বেনজীর আহমেদ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। এরপর থেকে তিনি নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন। তবে ডক্টরেট ডিগ্রি নেয়ার প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাই তার ছিল না।

শর্ত শিথিল করে তাকে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় সেই তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পাসপোর্ট নিয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ। এই কাজটি তিনি করেছিলেন ২০১৬ সালে, তখন তিনি র?্যাবের মহাপরিচালক। বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন তিনি করলে তখন আপত্তি জানিয়েছিল পাসপোর্ট অধিদপ্তর। র‌্যাব সদর দপ্তরে চিঠিও দেয়া হয়েছিল। জবাবে র‌্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল জলিল মণ্ডল অবিলম্বে বেনজীরের পাসপোর্ট প্রতিস্থাপনের অনুরোধ করে চিঠি দেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেনজীরকে পাসপোর্ট দেয়া হয়। ছবি তোলা ও আঙ্গুলের ছাপ নেয়া হয় তার বাসায় গিয়ে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন