জয়ের জন্য তখন বাংলাদেশের প্রয়োজন ৩ রানের। রাইলি মেরেডিথ বল করলেন আর বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ হুক করে পাঠালেন বাউন্ডারির বাইরে। ছক্কা! তাতেই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে রচিত হলো ইতিহাস। আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেকের দীর্ঘ ৪০ বছর
পর পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয় নিশ্চিত করলো টাইগাররা। তাও আবার এক ম্যাচ হাতে রেখেই। মিরপুরের ‘হোম অব ক্রিকেট’ মাঠে গতকাল অজিদের বিপক্ষে ব্যাটে-বলে পরিষ্কার দাপট দেখিয়ে দ্বিপক্ষীয় সিরিজটি নিজেদের করে নিয়েছে টিম বাংলাদেশ। বিশ্ব ক্রিকেটের সফলতম দলটির বিপক্ষে এই অবিস্মরণীয় জয় দেশের ক্রিকেটকে এক নতুন মর্যাদার আসনে বসালো। ওয়ানডে ক্রিকেটের সুদীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে শুধুমাত্র ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই কোনো দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ জয়ের রেকর্ড ছিল না। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে অবশেষে অজিদের হারিয়ে অধরা স্বপ্নের এক দুর্গ জয় করে নিলো মিরাজ বাহিনী। এটি দেশের মাটিতে টাইগারদের টানা পাঁচ ওয়ানডে সিরিজ জয়ের রেকর্ডও।
টস হেরে ফিল্ডিংয়ে নেমে শুরুতেই অজি ব্যাটসম্যানদের ওপর রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন বাংলাদেশের বোলাররা। পেসার তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান শুরুতেই অজিদের ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দল মাত্র শূন্য রানে প্রথম ৩টি উইকেট হারালো। তাসকিন নিজের প্রথম ওভারেই ম্যাথু শর্টকে বোল্ড করে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরত পাঠান। এরপর মোস্তাফিজুর রহমান নিজের জোড়া আঘাতে কুপার কনোলি ও ম্যাট রেনশ’কে ফিরিয়ে দিয়ে অজি শিবিরে কাঁপন ধরান। দুই পেসারের আগুনঝরা বোলিংয়ে দ্রুতই ২৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা অস্ট্রেলিয়ার হাল ধরেন মার্নাস লাবুশেন ও জেভিয়ার বার্টলেট। এই জুটি বিপর্যয় কাটিয়ে দলের স্কোর বাড়াতে লড়েন। লাবুশেন ৭৫ বলে ৫৫ রান ও বার্টলেট ৪৮ বলে ৫২ রান করে দুর্দান্তভাবে দলের চ্যালেঞ্জিং চূড়ান্ত সংগ্রহ ৮ উইকেটে ১৮৭ রানে নিয়ে যান।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ৪২তম ওভার শেষ হতেই মিরপুরে ঝুম বৃষ্টি নামে। দীর্ঘক্ষণ খেলা বন্ধ থাকার পর ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সামনে জয়ের নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২ রান। সেই লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ দল। ইনিংসের প্রথম ওভারেই ওপেনার তানজিদ হাসান শূন্য রানে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন। শূন্য রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর দলের হাল ধরেন সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত। এই দুই বাঁহাতির দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাগতিকরা। ২য় উইকেটে ৪৮ বলে তারা দলীয় পঞ্চাশ পূরণ করে মোট ৮৬ রানের চমৎকার এক জুটি গড়েন। সৌম্য ৪৭ বলে ৪২ রান করে আউট হন এবং শান্ত ৫৩ বলে ৪২ রানে বিদায় নিয়ে সাজঘরে ফেরেন। দুই সেট ব্যাটসম্যানের বিদায়ে ম্যাচটি শেষ দিকে কিছুটা রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে।
মাঝমাঠে লিটন কুমার দাস এসে দারুণ শুরু করলেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। তিনি ১৮ বলে ২১ রান করে ক্যামেরন গ্রিনের বাউন্সারে কট বিহাইন্ড হন। এরপর মোসাদ্দেক হোসেন উইকেটে এসে ৩টি চার মেরে ভালো ছন্দে থাকার ইঙ্গিত দেন। কিন্তু অ্যাডাম জ্যাম্পার বলে অহেতুক ঝুঁকি নিয়ে লং অফে ক্যাচ দিয়ে ১৫ রানে মাঠ ছাড়েন তিনি। অল্প সময়ের ব্যবধানে উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ দল বেশ চাপে পড়ে যায়। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হাল ধরেন তরুণ তাওহিদ হৃদয়। ঠাণ্ডা মাথায় ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দারুণ ব্যাটিং করে দলের হাল শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেন হৃদয়। হৃদয় ৫৫ বলে ৪০ রানের হার না মানা এক দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন। তার এই অনবদ্য শান্ত মেজাজের ব্যাটিং বাংলাদেশকে জয়ের বন্দরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায় অত্যন্ত সফল সুচারুভাবে।
হৃদয়ের সঙ্গে যোগ দেন অধিনায়ক মিরাজ। ইনিংসের ৩৪তম ওভারে ঘটে এক রোমহর্ষক ঘটনা। অজি ডানহাতি পেসার নাথান এলিসের একটি গতিশীল বাউন্সার সরাসরি আঘাত হানে মিরাজের হেলমেটে। ব্যথায় হাঁটু গেড়ে মাঠে বসে পড়েন তিনি, এমনকি কিছুটা বমিও করেন। মাঠে স্ট্রেচার আনা হলে গ্যালারিতে স্তব্ধতা নেমে আসে। তবে লড়াকু অধিনায়ক মাঠ ছাড়েননি। প্রাথমিক চিকিৎসার পর হেলমেট পরে বীরের মতো ক্রিজে দাঁড়ান তিনি। এরপর ২২ বলে ২২ রান করে দলের জয় নিশ্চিত করতে লড়ে যান। মেরেডিথের করা ওভারের শেষ বল হুক করে বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে ৫ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় এনে দেন অধিনায়ক। ৩৬ বল বাকি থাকতেই পাওয়া এই ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে গোটা স্টেডিয়াম।
