কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন মমতা-অভিষেক

কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন মমতা-অভিষেক

ফন্ট সাইজ:

পরপর দু’দিনে নয়াদিল্লির ১০ নং জনপথে সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে একান্তে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন মমতা ও অভিষেক। সোমবার ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আলিঙ্গন করেছিলেন। আর তার পরদিন বিকালেই মমতা ছুটে গিয়েছিলেন সোনিয়ার বাড়িতে একান্তে বৈঠক করতে। রাজীব গান্ধীর স্নেহের পাত্রী ছিলেন মমতা। সেই সূত্রে সোনিয়াও মমতাকে স্নেহ করেন। তবে সোনিয়ার সঙ্গে মমতার এই বৈঠক সম্পর্কে কেউই মুখ খোলেন নি। বুধবার একই বাড়িতে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ, সম্ভাব্য ভাঙন এবং বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ নিয়ে রাহুল এবং অভিষেকের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে জরুরি বৈঠক ডেকেছে কংগ্রেস। তাতে সব রাজ্যের প্রদেশ সভাপতি এবং সব রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকদের তলব করা হয়েছে। মাত্র একদিনের নোটিসে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব এই ধরনের বৈঠক ডাকছে, সেটা বিরল। ফলে মনে করা হচ্ছে, ওই বৈঠকে বড় কোনও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে দলের নেতাদের অবহিত করতে চাইছে কংগ্রেস।
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় কংগ্রেসকে নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নাসিকতা ছিল চরমে। নির্বাচনে কোনো দলের সাহায্য তার প্রয়োজন নেই বলে ঘোষণাও করেছিলেন অহঙ্কারের সঙ্গে। আর পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসকে নিশ্চিহ্ন করার অনেক রকম চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। এবার বিপদে পড়ে সেই কংগ্রেসকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছেন বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের সংযুক্তিকরণ নিয়ে দুই দলের শীর্ষস্তরে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। কংগ্রেসের তরফ থেকে মমতাকে যোগদানের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কংগ্রেসের এই প্রস্তাব মমতা মানবেন কিনা তা সময়ের অপেক্ষা। আর এই প্রস্তাব নিয়েই মমতা বুধবার বিকালে কলকাতায় ফিরে এসেছেন অনুগতদের সঙ্গে আলোচনা করতে।

তবে দুই দলের সংযুক্তিকরণ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। প্রদেশের একটা অংশ মনে করছেন, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর হাত ধরার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এই সময় মমতাকে সঙ্গে নেয়ার অর্থ, তৃণমূলের ১৫ বছরের দুর্নীতি, অপশাসনের দায় নিজেদের গায়ে মাখা। অধীর চৌধুরী, আবদুল মান্নানের মতো প্রবীণ নেতারা এই দলে। আবদুল মান্নান যেমন সাফ বলে দিচ্ছেন, “আমার কংগ্রেস নেতৃত্বের উপর আস্থা রয়েছে। নো অ্যালায়েন্স উইথ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।” একই সুর অধীরেরও। তিনি বলছেন, “যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় কংগ্রেস ভাঙিয়েছিলেন, তাকেই এবার গান্ধী পরিবারের কাছে গিয়ে হাতে-পায়ে ধরতে হচ্ছে। পাপের ফল ভোগ করতে হবেই।”
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের সুর তুলনায় নরম। তিনি মনে করেন, যদি কেউ দলে আসতে চান, তাহলে তাকে আগে মেনে নিতে হবে যে রাহুল গান্ধীই কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতা এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ। শুভঙ্করের বক্তব্য, “রাহুল গান্ধীকে ভাবি প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়ে যারাই কংগ্রেসে আসবেন তাদের প্রত্যেককে স্বাগত।” অভিষেকের ক্ষেত্রে অবশ্য শুভঙ্কর কড়া। তার সাফ কথা, “কারও গায়ে যদি দুর্নীতির দাগ লেগে থাকে, কেউ যদি নিজেকে বাঁচাতে কংগ্রেসের ছাতার তলায় আসতে চান, তাহলে তার জন্য দরজা খোলা হবে না।”

কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে মমতা-অভিষেকের বৈঠকের মাঝেই বুধবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরাই তৃণমূল কংগ্রেস। আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি না।’ বুধবার বিধানসভার বাইরে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করলেন, ইতিমধ্যেই ৫৮ থেকে বেড়ে সংখ্যাটা ৬৪ হয়েছে। এই সংখ্যাটা আরও বাড়বে। তৃণমূল কংগ্রেসের এই ভাঙনের মাঝেই দিল্লিতে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মমতার কংগ্রেসে যোগদান নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঋতব্রত বলেন, “আমরাই তৃণমূল কংগ্রেস। আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি না।”
তিনদিনের দিল্লি সফর সেরে কলকাতায় ফিরেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু আসেন নি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শোনা যাচ্ছে, কলকাতা ফেরার জন্য দিল্লি বিমানবন্দরে গিয়েও ফিরে গিয়েছেন তিনি। মনে করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সই জাল কাণ্ডে সিআইডি’র হাতে গ্রেপ্তারি এড়াতে আরও একটা রাত রাজধানীতেই কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

আরও এক তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদের পদত্যাগ: তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন অব্যাহত। লোকসভার পর রাজ্যসভাতেও শুরু হয়েছে পদত্যাগের পালা। দু’দিন আগেই সুখেন্দু শেখর রায় রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এবার তৃণমূলের আরও এক রাজ্যসভার সাংসদ সুস্মিতা দেব পদ ছাড়লেন। এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ সংখ্যা কমে দাঁড়ালো ১১। চলতি ও আগামী সপ্তাহের মধ্যে আরও দুই তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ নিজেদের পদ ছাড়তে পারেন বলে সেই জল্পনা ক্রমে জোরালো হচ্ছে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দিল্লিতে তখনই সুস্মিতা দেব বুধবার সাংসদ পদে ইস্তফা দিয়েছেন। সেইসঙ্গে জানিয়েছেন, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যপদও ছেড়ে দিয়েছেন। দল ছাড়ার পরই তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক দেশে ও স্বাধীন দেশে, কে কোন দলে যাবে, তা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।” সেই সঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলার রাজনীতির সঙ্গে তার সরাসরি যোগ কোনোদিনই ছিল না। আর তৃণমূলের ভেতরে কী হচ্ছে, না হচ্ছে, তা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। আসামের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।”

বুধবার দিল্লিতে সুস্মিতা দেব আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিজেপিতে তার যোগ দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে চর্চা শুরু হয়েছে।
সুস্মিতা দেব আসামের বাসিন্দা। দলের আসামের সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়ে মমতা তাকে রাজ্যসভার সাংসদের জন্য মনোনীত করেছিলেন।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন