প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে ৫ বিষয়ে সই হচ্ছে সমঝোতা স্মারক

ফন্ট সাইজ:

মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২১শে জুন তারেক রহমানের কুয়ালালামপুর সফর চূড়ান্ত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর পরই সফর ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ শুরু হয়। এক্ষেত্রে উদ্যোগী ছিল মালয়েশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের তরফে তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপরই কুয়ালালামপুর সফরে মত দেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে মালয়েশিয়ার তরফে বেশ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এবারের সফর শুধু সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন তারেক রহমান। সুতরাং তার প্রথম বিদেশ সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের বেশ আগ্রহ রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত ও চীনের বিকল্প হিসেবে কুয়ালালামপুরকে বেছে নেয়া আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সম্পর্কে সরকারের ভারসাম্য রক্ষার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে নানা পর্যায়ে সম্পর্ক রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম ভিত্তি শ্রমবাজার। গত কয়েক বছর ধরে মালয়েশিয়ার এই খাতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এই স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের সচল করতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেয়া উদ্যোগগুলো আরও জোরদার করেছে বর্তমান সরকার। সূত্র বলছে, সরকার শুধু শ্রমবাজারেই গুরুত্ব দিচ্ছে না, দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে আরও বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্কে নতুন গতি আনতে চায় ঢাকা। এই লক্ষ্যে এবার কুয়ালালামপুরের সঙ্গে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারকে সই হচ্ছে। যার মধ্যে সংস্কৃতি, হালাল শিল্পে সহযোগিতা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে কাঠামোগত আলোচনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পুলিশ ও নিরাপত্তা খাতে সমন্বয় জোরদারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকার উচ্চ পর্যায়ের একটি কূটনৈতিক সূত্র। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে না। তবে পুরনো চুক্তিগুলো নিয়ে দুই দেশের সরকার প্রধানের মধ্যে কথা হতে পারে। তারেক রহমানের এই সফর বেশ বিস্তৃত। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হবে। এ ছাড়া সফরকালে কুয়ালালামপুরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করারও কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

সফরে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হবে। যার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপদেষ্টা মাহদী আমিন থাকবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীসহ আরও কয়েকজন মন্ত্রীও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হতে পারেন। ২২শে জুন মালয়েশিয়া সফর শেষে সেখান থেকে চীন সফরে যাবেন তারেক রহমান। সূত্রের তথ্যমতে, প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের আগে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ২৩ থেকে ২৬শে জুন। সফরটি ঘিরেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। চীন সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম আজ বেইজিং যাচ্ছেন বলে সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। ২১শে জুন শুরু হওয়া দুই দেশের সফর শেষে তারেক রহমানের ২৬শে জুন ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
পাঁচ দশকের সম্পর্কে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা: বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের। ফরেন অ্যাফেয়ার্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় মালয়েশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এবং এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াই প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ততার সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থান করলেও পারস্পরিক স্বার্থ ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দুই দেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে। শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলেও বর্তমানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, পর্যটন, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রেও সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগও নিয়মিত। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সফর, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং বিভিন্ন যৌথ কমিশনের কার্যক্রম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে উভয় দেশ একে-অপরকে সমর্থন দিয়ে থাকে। একইসঙ্গে উভয় দেশ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম), ওআইসি, ডি-৮, জি-৭৭ এবং কমনওয়েলথের সদস্য।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশ বর্তমানে মালয়েশিয়ার অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) নিয়েও আলোচনা চলছে। এ ছাড়া, হালাল শিল্প, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং বিনিয়োগ সহযোগিতাকে নতুন সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও পেশাগত কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। সবমিলিয়ে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের সম্পর্ক এখন শুধু শ্রমবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন