পুশইনরোধে সীমান্তে নির্ঘুম রাত বিজিবি’র

পুশইনরোধে সীমান্তে নির্ঘুম রাত বিজিবি’র

ফন্ট সাইজ:

দেশের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলে বিএসএফের পুশইনচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে বিজিবি এবং সীমান্তবাসীর কড়া পাহারায় বিএসএফের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। গত ক’দিন থেকে সীমান্ত জুড়ে দিনরাত কড়া নজরদারি চালাচ্ছে বিজিবি সদস্যরা। তাদের সঙ্গে আছে গ্রামবাসী। গতকালও পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামের রৌমারী, মেহেরপুর, দিনাজপুরের হাকিমপর সীমান্তে অর্ধশতাধিক ভারতীয়কে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবি বরাবরের মতো সেই চেষ্টাও রুখে দিয়েছে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, তিনদিন ধরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকার শূন্যরেখা সংলগ্ন একটি ভারতীয় কৃষিজমিতে খোলা আকাশের নিচে থাকা পুশইনকৃত ১০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর ব্যাপারে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। জীবনের ঝুঁকির মধ্যে এসব মানুষ অর্ধাহারে-অনাহারে কাটাচ্ছেন দিনরাত। সেই সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও ঝড়-বৃষ্টিতে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। গতকাল তৃতীয় দিনের মতো ভারতের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে কাদা পানির মধ্যে অবস্থান করছেন তারা। বিজিবি ও বিএসএফের নিñিদ্র প্রহরায় তারা ভারতীয় শূন্যরেখার মধ্যে থেকে মানবেতর দিনরাত অতিবাহিত করছে। দুপুরের দিকে একবার বিএসএফ তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করলেও বিজিবি ও স্থানীয়দের প্রতিরোধে তারা আগের স্থানে তাদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

বড়বাড়ি সীমান্তের বাংলাদেশের শূন্যরেখায় গিয়ে দেখা গেছে, বড়বাড়ি প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকার ভারতীয় শূন্যরেখার জমির আইলেই এখন পর্যন্ত অবস্থান করছে ১০ জন নারী-পুরুষ ও শিশু। আইলের দু’পাশের জমিতে পানি জমে থাকায় তারা কোথাও নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারছে না। প্রখর রোদের মধ্যে অবস্থান করে অমানবিকভাবে দিনরাত অতিবাহিত করছে। তিনদিন ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাদা পানির মধ্যেই শুয়ে বসে আছেন। তাদের খাবার ও পানির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে না। সকালে বিজিবি’র পক্ষ থেকে খাবার পানি দেয়ার চেষ্টা করলে বিএসএফ বাধা দেয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিএসএফ ভারতীয় শূন্যরেখায় অবস্থানকারী ১০ জনকে আবারো বাংলাদেশের শূন্যরেখায় ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি বাধা দেয়। এ সময় ওই সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে বিএসএফ তাদের নিয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়।

শুক্রবার ভোর রাতে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তের মেইন পিলার ৭৫৮ এর ৫ নম্বর সাব পিলার এলাকা দিয়ে ওই ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় বিএসএফ তাদের শূন্যরেখার আবাদি জমির আইলেই আটকে রাখে।

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা রুখে দিয়েছে স্থানীয় গ্রামবাসী ও বিজিবি। শনিবার রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা ধরে সীমান্ত এলাকায় এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। সীমান্তবর্তী বকবান্দা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে নারী ও শিশুসহ প্রায় ৩০ জন ভারতীয় নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে খবর দেয়। পরবর্তীতে বিজিবি সদস্য ও স্থানীয় এলাকাবাসী একজোট হয়ে এই পুশইনের প্রচেষ্টা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করেন।

সূত্র জানায়, ভারতের মানকাচর ও বাংলাদেশের বকবান্দা সীমান্তের ১০৬৯ নম্বর মেইন পিলার সংলগ্ন এলাকায় বিএসএফ এই অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ রৌমারী উপজেলার খেওয়ারচর বিওপি’র বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলেন। বিজিবি’র সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীও সারা রাত সীমান্ত পাহারা দেন।
জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান পিএসসি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি’র নজরদারি ও টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে।

হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, ভারত থেকে অবৈধ পুশইন ঠেকাতে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে টহল জোরদার করেছে বিজিবি। স্থানীয় গ্রামবাসী ও গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে রাতদিন সমানতালে যৌথভাবে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে বিজিবি সদস্যরা। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় মাইকিং, মসজিদ ও মাদ্রাসায় স্থানীয় সাধারণ মানুষকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিজিবি’র পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।

এদিকে, শনিবার ভোর রাতে হিলির ঘাসুড়িয়া সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক পাঁচজন ভারতীয় নাগরিককে পুশইন চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় ও বিজিবি’র সতর্ক অবস্থানের কারণে পুশইন করতে ব্যর্থ হয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। এদিকে, এ ঘটনাকে মাথায় রেখে সীমান্তে টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।

মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, মেহেরপুরের গাংনী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনে ব্যর্থ হয়ে নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। শনিবার রাত ৩টার দিকে তাদের ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ। এর আগে শনিবার ভোরে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তের ১৪০/৫-এস আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের কাছে দিয়ে ওই ৬ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তেঁতুলবাড়ীয়া বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, ভারতের নদীয়া জেলার মুরুটিয়া থানার বেতা রামচন্দ্রপুর এলাকা দিয়ে নারী, শিশুসহ ৬ জনকে গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। এ সময় বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দিলে বিএসএফ তাদের সীমান্তের ওপারে ফিরিয়ে নেয়। বিজিবি’র দাবি, এ ঘটনায় উভয়পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সীমান্তে অবস্থানরত ৬ জনের বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

বিজিবি জানায়, ওই ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের গুজরাটে বসবাস করছিলেন। ভারতীয় পুলিশ তাদের আটক করে এক মাস কারাভোগের পর সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসে। পরে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। ওই ৬ জন হলেনÑ আমিন মোল্লা (৮০), আব্দুল্লাহ (৫০), জামরিল নড়াইল (৪৫), রিফুজান (৬৫), রেকায়া (৪০) ও ইব্রাহিম (৭)। তাদের সবার বাড়ি নড়াইলের কালিয়া উপজেলার জামরিলডাঙ্গা গ্রামে। প্রায় ৪০ বছর আগে তারা ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে গুজরাটে বসবাস শুরু করেন।

এ ঘটনায় অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকে কাথুলী বিওপি’র কোম্পানি কমান্ডার ওসিকুর রহমান, তেঁতুলবাড়ীয়া ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান এবং ভারতের মুরুটিয়া থানার বেতা রামচন্দ্রপুর ক্যাম্পের এসআই রাজেন্দ্রকুমার পোয়ালি উপস্থিত ছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন